প্রাণশক্তির প্রচ্ছন্ন উৎসের সাথে সংযোগ স্থাপন প্রসঙ্গে পরমহংস যোগানন্দ

১০ই এপ্রিল, ২০২৪

ভূমিকা:

তোমরা কি অধিকতর প্রাণশক্তি কামনা করো? আমরা সবাই তাই চাই। এর প্রাপ্তির জন্য আমরা যা আহার করি, আমরা যেটুকু বিশ্রাম পাই, অথবা আমরা যেভাবে বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করি, এবং আপন স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য যে সংকল্প এবং উদ্দীপনার সাথে অগ্রসর হই, তা সমন্বয়পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। তা হলেই আমাদের কর্মশক্তি এবং দৃষ্টিভঙ্গি উন্নততর হবে।

কিন্তু পরমহংস যোগানন্দজির শিক্ষা আমাদের জীবননাট্যের অন্তরালে প্রাণশক্তির সাথে সচেতনভাবে সংযোগ স্থাপন করার ফলস্বরূপ আমরা কীভাবে অফুরন্ত কর্মশক্তি ও পরিপূর্ণ জীবনীশক্তি নিয়ে দিনযাপন করতে পারি, তার উপরই সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করে থাকে।

ওয়াইএসএস/এসআরএফ-এর সঙ্ঘমাতা ও তৃতীয় অধ্যক্ষ শ্রী দয়ামাতা একবার বলেছিলেন, “মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, প্রকৃত সত্য হল যে আমাদের প্রতিক্ষণের অস্তিত্ব অদৃশ্য দিব্য উৎস থেকে অবিরাম প্রবহমান প্রাণ, প্রাণশক্তি ও বোধির ওপর নির্ভরশীল।”

এবং তিনি উল্লেখ করেছেন যে যৌবন, যাকে ক্ষণস্থায়ী বাহ্যিক অবস্থা বলে মনে করা হয়, তা প্রকৃতপক্ষে “অন্তর থেকে বিকীর্ণ মানসিক ও আত্মিক প্রাণশক্তি — যা ঈশ্বরের শাশ্বত শক্তি ও আনন্দের সাথে আমাদের গভীর আত্মিক সংযোগের সুখানুভূতি।”

আমরা আশা করি আপনি এই অনুপ্রেরণাকে উত্তরোত্তর উচ্চস্তরীয় প্রাণশক্তিসম্পন্ন হবার লক্ষ্যে প্রয়োগ করবেন — পরমহংসজি প্রদত্ত জ্ঞানসম্ভার গ্রহণ এবং সহজ অথচ শক্তিশালী প্রক্রিয়াগুলি অভ্যাসের মাধ্যমে প্রাণের মহা উৎসের সাথে সংযোগসাধনে সক্ষম হবেন।

পরমহংস যোগানন্দ প্রদত্ত ভাষণ ও রচনা থেকে উদ্ধৃতি:

যখন কোনো পাহাড়ের চূড়া থেকে তুমি শহরের ঝলমলে আলোর অপূর্ব দৃশ্য দেখো, তুমি ভুলে যাও যে ডায়নামো থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ বাল্বগুলির আলোর উৎস। সুতরাং যখন প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ কাউকে দেখো, এবং তার প্রাণবন্ততার কারণ আন্দাজ করতে পারো না, তখন তুমি আধ্যাত্মিক দৃষ্টিশক্তিহীন। এই প্রচ্ছন্ন শক্তিটি সুস্পষ্ট। সে সর্বক্ষণ আমাদের চিন্তাধারার সাথে লুকোচুরি খেলছে।

বাহ্যিক শক্তির (খাদ্য, বায়ু এবং সূর্যকিরণ) প্রভাবে [শরীরের সাথে] প্রাণ সংযুক্ত থাকে; এবং অন্তঃস্থিত উৎস থেকে সঞ্চারিত প্রাণশক্তির প্রভাবে ব্রহ্মচৈতন্য জাগরিত হয়। অভ্যন্তরীণ আত্মিকশক্তি থেকে উদ্ভূত প্রাণশক্তি ও চৈতন্য ব্যতিরেকে শারীরিক শক্তির বাহ্যিক উৎস শরীরে প্রাণপ্রবাহ বজায় রাখার কাজে অনুপযুক্ত।

মাংসপিণ্ডে প্রাণপ্রবাহ সঞ্চারিত করে ঈশ্বর আমাদের নিরেট স্থূলবস্তুতে আবদ্ধ শক্তিদূতরূপে তৈরি করেছেন। কিন্তু শরীরের অসামর্থ্য আর নানাবিধ দুর্বলতাকে অবিরত প্রাধান্য দেওয়ার ফলে আমরা ভুলে গিয়েছি আমাদের রক্তমাংসের শরীরের অন্তর্নিহিত চিরস্থায়ী, অবিনশ্বর শক্তির বৈশিষ্ট্য কিভাবে অনুভব করা যায়।

১৯১৬-তে আমার আবিষ্কৃত ও উন্নীত শক্তিসঞ্চার ব্যায়ামগুলি দেহকে জীবনদায়ী প্রাণশক্তির সাহায্যে সচেতনভাবে উজ্জীবিত করার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট, সহজসাধ্য ও ক্লান্তিহীন পদ্ধতি। এর প্রভাবে দেহের শোণিত ও কোশগুলো উদ্দীপিত ও বিশেষভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে রোগপ্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলে।

রক্ত প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ রাখার জন্য শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রিয়া সঠিক রাখা জরুরি… । এই প্রক্রিয়াটি শিখে অনুশীলন করো: প্রথমে সজোরে জোড়া শ্বাস ছাড়ো (একটি ছোটো ও অপরটি দীর্ঘ শ্বাস)। এরপর ফুসফুস ভরে তৃপ্তিকরভাবে জোড়া শ্বাস নাও (একটি ছোটো ও অপরটি দীর্ঘ শ্বাস)। কয়েক সেকেন্ড ফুসফুসে শ্বাস ধরে রেখে অক্সিজেনকে প্রাণশক্তিতে পরিবর্তিত হতে দাও। এরপর জোড়া শ্বাস ত্যাগ করে আবার জোড়া শ্বাস নাও। মুক্ত বাতাসে সকালবেলা প্রক্রিয়াটি ৩০ বার এবং রাত্রে ৩০ বার অভ্যাস করো। প্রক্রিয়াটি খুব সহজ। এটি অভ্যাস করলে তুমি আগের চেয়ে অনেক বেশি সুস্থ থাকতে পারবে। এই ব্যায়ামটি অতিরিক্ত প্রাণশক্তির যোগান দেয়; এবং তোমার রক্তকে অঙ্গারমুক্ত করে মনকে শান্ত করে।

তোমার সকল কর্তব্যকর্ম গভীর সুখানুভূতি এবং তোমার মধ্যে একটি নির্ভীক প্রফুল্লতার জাগরণের সাথে সম্পন্ন করো। তাহলে দৈনন্দিন কাজকর্মের সময় তোমার সমস্ত শরীরে প্রাণশক্তির জোয়ার অনুভব করবে।

এই বিধিনিয়মগুলি অনেকেরই জানা আছে, কিন্তু খুব কম লোকই এর অভ্যাস করে: সর্বক্ষণ মনে করবে যে তোমার দেহ প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ, বিশেষ করে যখন দুর্বলতা অনুভব করবে, তখন দেখবে তোমার মন থেকে শরীরে শক্তি সঞ্চারিত হচ্ছে। বাহ্যিক জড় উৎস যেমন খাদ্য, বায়ু, এবং সূর্যালোক ছাড়াও তুমি তখন প্রাণশক্তির একটি নতুন, গোপন ও অদৃশ্য উৎস খুঁজে পেতে শুরু করবে।

এই জীবনের উৎস সম্পর্কে যদি তুমি সচেতন থাকো, তাহলে একে টিকিয়ে রাখার শক্তির উৎস থেকে তুমি অবিরত শক্তি আহরণ করতে পারবে। …এই জীবনবেদ অধিকাংশের কাছে অজ্ঞাত থাকলেও তারা সর্বক্ষণই ঈশ্বরদত্ত শক্তিকেই কাজে লাগায়। এই শক্তি সম্পর্কে সচেতন থাকলে ক্ষতি কী?

অনুভব করো যে তুমি ঈশ্বরদত্ত সৃজনশীল, জীবনদায়ী প্রাণশক্তিতে উদ্দীপিত। অনুভব করো যে অতীতের ব্যর্থতার স্মৃতি, ভীতি, রোগ ও বার্দ্ধক্য মুছে গিয়ে ঈশ্বরের চিরন্তন সচেতনতা তোমার মধ্যে প্রতিভাত। গভীর মনোযোগের সাথে বার বার পুনরাবৃত্তি করো: “পিতঃ, তুমি আমার শরীর, মন, এবং আত্মায় অবস্থান করছো। আমি তোমারই ভাবমূর্তিতে গঠিত। আমার দেহ, মন এবং আত্মাকে আশীর্বাদ করো, তারা যেন তোমার চিরন্তন যৌবন, শক্তি, অমরত্ব, এবং পরমানন্দে উদ্ভাসিত থাকে।”

জীবনকে আরও প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ করার উপায় এবং উপরে উল্লিখিত পরমহংসজির শক্তিসঞ্চার ব্যায়াম সম্পর্কে জানতে হলে আমরা আপনাকে দ্য ডিভাইন রোমান্স বই থেকে উদ্ধৃত “দ্য সিক্রেট অফ ভাইটালিটি” পাঠ করার আমন্ত্রণ জানাই।

এই শেয়ার করুন