যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া/সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ-এর অধ্যক্ষ এবং আধ্যাত্মিক প্রধান শ্রীশ্রী স্বামী চিদানন্দ গিরি কর্তৃক প্রদত্ত ভাষণ “জড়জগতে বসবাসকালীন দিব্য সংযোগ বজায় রাখা” থেকে উদ্ধৃত। ১০ নভেম্বর, ২০১৯-এ ওয়াইএসএস, মুম্বাইয়ে তিন দিনের অনুষ্ঠিত কার্যক্রমের শেষ দিনে প্রদত্ত সম্পূর্ণ ভাষণটি আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে লভ্য।
এই উদ্ধৃতির শুরুতে স্বামী চিদানন্দজি মুম্বাইতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মতো সমাবেশে যোগদানরত অনুসন্ধানকারীদের মধ্যে বিশেষ করে তাঁর ভাষণের একদিন আগে অনুষ্ঠিত তাঁদের সম্মিলিত গভীর ধ্যানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা আধ্যাত্মিক বন্ধন এবং যথার্থ দিব্য সখ্যতার ওপর মন্তব্য করেন।
এই ধরণের সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে আমি সর্বদাই এই ভেবে বিস্ময়াপন্ন হই যে আমরা কত অন্তরঙ্গই না হয়ে পড়েছি। এখানে আসার আগে আপনাদের অনেকের সঙ্গেই কখনও বাহ্যত সাক্ষাৎ হয় নি — মুম্বাইয়ে আমার এই প্রথমবার আসা—তবুও, এই তিন দিনে, আমরা সবাই দিব্য সখ্যতার এক সুন্দর বন্ধন অনুভব করছি।
আমি ওই ভাবেই মনে করি; আমার মনে হয় ওই বন্ধন সবচেয়ে দৃঢ় হয় গতকাল আমাদের একত্রে অতিবাহিত তিনঘন্টাব্যাপী ধ্যানে — যেখানে আমরা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা ও আধ্যাত্মিক চেতনার দিব্য বলবর্ধক কূপের গভীর থেকে গভীরতম স্থানে ডুব দিয়েছিলাম।
আমরা যখন একত্রে ধ্যান করি, তখন আমরা আমাদের বুদ্ধিমত্তা, অথবা আমাদের মানসিক আবেগের চেয়ে গভীরতর একটি আধ্যাত্মিক বন্ধন সৃষ্টি করি; এবং সেইজন্য তুলনামূলকভাবে বলতে গেলে, আমরা বাহ্যিকভাবে একসাথে কম সময় কাটালেও অন্তরে এই সংযোগের শ্রেষ্ঠত্ব, গভীরতা ও তীব্রতা আমাদের দিব্য সখ্যতার একটি অনুভবনীয় প্রকৃত বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। আপনাদের সাথে এই দিনগুলি কাটানোর কথা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।
ধ্যান কীভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধন করতে সমর্থ হয় তা একাধারে কৌতুহলোদ্দীপক ও প্রণিধানযোগ্য। যখন আমরা অন্যান্য মানবাত্মার সাথে একত্রে অন্তর্মুখী হয়ে সচেতন অন্তরাত্মার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করি — কিছুক্ষণের জন্য হলেও আত্মিক সচেতনতার উচ্চতর স্তর থেকে আমরা একত্রে স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসার পরিবেশ সৃষ্টি করি; স্বতঃস্ফূর্তভাবে শ্রদ্ধা এবং প্রশংসার সৃজন হয় যা সুমধুর দিব্য সখ্যতাকে আরও গভীরতর করে। এখন, বর্তমান যুগে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেন?
“মানবতার প্রত্যাশা”
বর্তমান বিশ্বজগতের দিকে একবার চেয়ে দেখুন। এত অশান্তি আর হানাহানি; আমাদের মধ্যে বিভিন্ন স্বার্থ, মতবাদ এবং কার্যাবলির সংঘাত। এই পৃথিবীতে সকলের সাথে মিলেমিশে থাকা সহজ নয়। আমাদের মতবাদ অনুসারে আধ্যাত্মিক উন্নতির সাথে অথবা মানবজাতির ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে আমরা সবাই ভাইবোনের মতো একসাথে থাকতে পারব। একটি পরিবার রূপে বিশ্ব হল বৈদিক শাস্ত্র থেকে নেওয়া এক প্রাচীন আদর্শ।
আমরা সকলেই ঈশ্বরের সন্তান এবং আমাদের সেই সম্প্রীতি ও শান্তি সহযোগে বাস করা উচিত। কিন্তু আমি নিশ্চিতরূপে জানি — এবং আমাদের গুরুদেব বারংবার বলেছেন — যে সমাজের সকল স্তরে প্রাত্যহিক গভীর ধ্যান পরিব্যাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এটি অধরাই থাকবে।
যখন মানুষ ক্রমাগত অধিকতর সংখ্যায় ধ্যানের মাধ্যমে অন্তরাত্মায় ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করার চেষ্টা করবে, তখনই আমরা খুঁজে পাবো ঈশ্বর-সান্নিধ্যের সেই দিব্য স্ফুলিঙ্গ, সেই দিব্য নির্যাস, সকল মানবাত্মায় ঈশ্বরের সেই উপস্থিতি। এই হল মানবজাতির বসুধৈব কুটুম্বকম অর্থাৎ বিশ্বভ্রাতৃত্বের আধারশিলা। বিশ্বশান্তি প্রত্যাশার জন্য এই হল বাস্তবসম্মত দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি।
আপনারা সকলেই প্রাত্যহিক প্রকৃত ধ্যানের অভ্যাস গড়ে তোলার শপথ নিয়েছেন — শুধু চুপ করে বসে আকাশ-পাতাল চিন্তা নয় বরং উচ্চস্তরীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গভীর, নিয়মনিষ্ঠা এবং অভিনিবেশ সহযোগে যোগীয় ধ্যান।
আপনারা যারা এই পথ অনুসরণ করছেন বা অন্য পথে দিব্য চেতনায় ডুব দেওয়ার আন্তরিক প্রচেষ্টা করছেন — আপনারাই হলেন মানবতার প্রত্যাশা।
এই কয়েকটি দিন একসাথে থেকে আমরা অপূর্ব আত্মিক সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছি; আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে সেই আধ্যাত্মিক নির্যাসের গঠন সম্পর্কে সম্ভবত এক দৃঢ় বিশ্বাস এবং উপলব্ধি জেগে উঠেছে। তবু, যদিও আমরা আত্মিক স্তরে চিরন্তন, অমর, ত্রুটিহীন এবং দিব্য, আমরা কিন্তু স্থূল শরীরেই বসবাস করি এবং স্থূল শরীরটিও স্থূল বাস্তব জগতেই বসবাস করে।
আমাদের সামনে এখন এইটাই পরীক্ষা: ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক উন্মোচনে অর্জিত দিব্য নির্যাসকে কীভাবে ধরে রাখা যায়; পার্থিব জগতে বাস করেও কীভাবে তার সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করা যায়।
ভাষণটির ভিডিও আমাদের ইউ টিউব চ্যানেলেও উপলব্ধ

















