শ্রীদয়ামাতার “ঈশ্বরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন”

৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

পদ্ম

নিম্নোক্ত উদ্ধৃতাংশ ‘ফাইন্ডিং দ্য জয় উইদিন য়্যু: পার্সনাল কাউন্সেল ফর গড-সেন্টার্ড লিভিংবইয়ের “ডিপেনিং ইওর লাভ ফর গড” বক্তৃতার অংশবিশেষ। শ্রী দয়ামাতা ছিলেন পরমহংস যোগানন্দের শুরুর সময়কার ও ঘনিষ্টতম শিষ্যদের একজন এবং ১৯৫৫ থেকে আমৃত্যু ২০১০ পর্যন্ত তাঁর সোসাইটির আধ্যাত্মিক প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

এমন চিন্তা করবেন না যে ঈশ্বরকে পেতে হলে আপনাকে সংসার ত্যাগ করে একটা আশ্রমে যেতে হবে। আপনি যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, তাঁর সাথে একটা প্রেমময়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে আপনি সময় পেতে পারবেন।

শুধুমাত্র এই দেশেই নয় বরং ভারত এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশে গুরুদেবের সোসাইটির কাজ দেখাশোনার দায়িত্বের সাথে আমিও আপনাদের মতই খুব ব্যস্ত। তবে ঈশ্বর সর্বাগ্রে। এই ব্যাপারে কোনো অন্তরায় আমি থাকতে দিই না। জরুরি হল ঈশ্বরের জন্য আকুলতা আর প্রত্যহ তাঁর ধ্যানের জন্য সময় বের করার ইচ্ছাশক্তি।

ধ্যান কখনই আপনার জন্য শুধুমাত্র একটা নিত্যনৈমিত্তিক, একঘেয়ে ঘটনা হয়ে না ওঠে। আমার ভ্রমণকালে আমি মন্দির, মসজিদ ও গির্জাতে গেছি আর বিশ্বজুড়ে ভক্তদের বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে প্রার্থনা করতে দেখেছি।

আমার মনে আছে জেরুজালেমের যে সকল পবিত্র স্থানে ঘুরেছি যেখানে জিশু খ্রিস্ট পদচারণা করতেন এবং ঈশ্বরসংযোগে থাকতেন, আর দেখেছি যে পাদ্রীকে যন্ত্রের মতো প্রার্থনা করতে, যাঁর কাছে প্রার্থনা করছিলেন তার থেকে তার শ্রোতাদের দিকে আগ্রহ ছিল বেশি। আমার অন্তরের অনুভূতি ছিল: “না, না, না! আপনি এখানে খ্রিস্টের সাথে একাত্ম হতে এসেছেন!”

একইভাবে, ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে পুরোহিতদের পূজা করতে আমি দেখেছি, ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কথা বলতে বলতে ব্যস্ত নজরে অন্যদের দিকে দেখছিলেন। যাঁর উদ্দেশ্যে তাদের প্রার্থনা ছিল ভক্তরা তাঁর কথা ভাবছিলেন না, তাই তিনি শুনছিলেন না!

একালে ধর্মপালনের ক্ষেত্রে সবথেকে বড়ো ত্রুটি হল যাঁকে ঘিরে ধর্ম আবর্তিত হওয়া উচিত বাহ্যিক ঘটনাচক্রের তন্ময়তায় তাঁকেই ভুলে যাওয়া।

গুরুদেব যেমন শিখিয়েছেন, আমরা ধ্যানে বসলে একমাত্র ঈশ্বরই আমাদের ধ্যানজ্ঞান হওয়া উচিত। আর কোনো চিত্তবিক্ষেপ আসতে না দিয়ে কম করে ঈশ্বরের সঙ্গে পাঁচ মিনিট আলাপ করুন, তাহলেই তাঁর সাথে আপনার সম্পর্ক ধীরে ধীরে আরও সত্যি হয়ে উঠবে।

একাগ্র আরাধনা উন্নত করার একটা উপায় হল মনে মনে বারংবার ঈশ্বরের নাম বা কোনো ছোট্ট ধারণা অথবা তাঁর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা। ভারতে এটাকেই জপযোগ বলে আর পাশ্চাত্য এটাকে একরকমের “উপস্থিতিকে অনুভব করা” বলে জানে।

ঈশ্বরের জন্য আন্তরিক আকুলতার প্রকাশে তাঁর উদ্দেশ্যে ভজন খুবই কার্যকরী — যেমন গুরুদেবের কসমিক চ্যান্টস – এর এক একটি। অনেক সুন্দর সুন্দর প্রেমগীতি আছে যেগুলি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে করা যেতে পারে, এমনকি সেগুলি যদি তাঁর উদ্দেশ্যে লেখা নাও হয়ে থাকে। “দ্য ইন্ডিয়ান লাভ কল” এমনিই একটা — গুরুদেব পছন্দ করতেন। মানব প্রেমিকের জন্য নয় বরং ঈশ্বরের উদ্দেশ্যেই এরকম আবেগ ও আকুলতার নিবেদন কতই না রোমাঞ্চকর হতে পারে।

এছাড়াও, মহাত্মাদের জীবনী পড়ুন, যেমন সর্বদা ঈশ্বরপ্রেমে নিমগ্ন থাকা গুরুদেবের জীবনী।

আপনি খুব ভালোবাসেন, যার ভালোবাসা আপনার জন্য এক প্রেরণা হয়ে আছে এমন কারো সম্বন্ধে চিন্তা করা ভক্তি জাগরণে খুব সাহায্য করে। গুরুদেব তাঁর মায়ের প্রতি থাকা আনন্দঘন, উদার ও অনাবিল ভালোবাসার কথা ভাবতেন; তিনি তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। কারো ওপর আপনি যেমন ভালোবাসা অনুভব করেন — ধরা যাক আপনার মা — আপনার সেই মন এবং অনুভূতি জগন্মাতার দিকে ঘুরিয়ে দিন। “ও জগন্মাতা, আমি জানি তুমিই আমার মায়ের রূপে আমার কাছে এসেছ।”

তিনি পিতা-মাতা, স্বামী, স্ত্রী, সন্তান অথবা সুহৃদ হতে পারেন। ওই বিশিষ্টজনের মনোরম গুণের কথা ভাবুন আর আপনার হৃদয়ে যখন প্রেম জেগে উঠবে, তৎক্ষণাৎ ঈশ্বরের ওপর মনোনিবেশ করুন। ওই সময়ে ভাবুন: “তুমি যদি তার মধ্যে প্রেম সঞ্চারিত না করতে, সে আমাকে ভালোবাসতে পারত না।” যাবতীয় প্রেম ঈশ্বরের থেকেই আসে। আপনি যখন এইভাবে ভাববেন, তখন আপনি যাদের ভালোবাসেন উত্তরোত্তর তার আড়ালে থাকা সেই প্রেমকে অভ্যাস করা শুরু করবেন।

সারাদিনে, আপনাকে সাহায্য করার জন্য যখনই কেউ কিছু করছে, সবসময় সেই অনুগ্রহের আড়ালে পরমপিতার প্রভাব উপলব্ধি করুন। আপনার সম্বন্ধে শুভ কিছু যখনই কেউ বলছে, সেই শব্দগুলোর পিছনে পরমপিতার কণ্ঠস্বর শুনুন। আপনার জীবনে যখনই কিছু শুভ বা সুন্দর অনুগ্রহ আসে, পরমপিতার থেকে তা এসেছে অনুভব করুন।

আপনার জীবনের সবকিছুকেই ঈশ্বরের সম্পর্কে আনুন। এভাবে ভাবা শুরু করুন, অতঃপর একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করবেন, “ওহ, একমাত্র তিনিই আছেন যাঁর সাথে আমার সবকিছু জুড়ে আছে।”

ঈশ্বর সকল মনুষ্য জীবনের সর্বজনীন তত্ত্ব। আমাদের সমস্ত কর্মকান্ডের পিছনে তিনিই মূল চালিকাশক্তি, আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ শুভাকাঙ্খী ও পৃষ্ঠপোষক। তাঁর প্রতি প্রেম নিবেদনের বিনিময়ে তাঁর ভালোবাসা পাবার জন্য এর থেকে বেশি উদ্দীপক আর কি হতে পারে?

পদ্ম

এই শেয়ার করুন