২০০৭-এ লস অ্যাঞ্জেলস-এ এসআরএফ বিশ্ব সমাবর্তন উৎসবে সন্ন্যাসিনী, নমিতা মাই প্রদত্ত সৎসঙ্গের (প্রশ্নোত্তর) অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরা হল। নমিতা মাই পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপের একজন সন্ন্যাসিনী এবং প্রায় চার দশক ধরে শ্রী দয়ামাতার (প্রিয় সংঘমাতা এবং ওয়াইএসএস/এসআরএফ — এর তৃতীয় অধ্যক্ষ) অফিসে তাঁর একজন সচিব এবং ব্যক্তিগত সহকারী পদের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বর্তমানে লস অ্যাঞ্জেলেস — এর এসআরএফ মাদার সেন্টারে থাকেন। “সবার মধ্যে ঈশ্বরকে দেখা,” শিরোনামে এই সৎসঙ্গের সম্পূর্ণ অংশ যোগদা সৎসঙ্গ পত্রিকার ২০২৫-এর বার্ষিক সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
প্রশ্ন: “আমি অন্যদের ভালোবাসতে চাই, তাদের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাই। আপনি কি আমাকে এই কাজে পথ দেখাতে পারেন?”
এটি একটি বিশাল বিষয়, তবে সবচেয়ে সহজ উত্তর হল, যখন আমরা ধ্যানে ভগবৎ প্রেমের মাধুর্য অনুভব করতে শুরু করি, তখন সেই ভালোবাসা অন্যদের কাছে পৌঁছোয়।
যখন আমরা বুঝতে শুরু করি যে, ঈশ্বর সকলের মধ্যেই আছেন, আমরা প্রত্যেকেই সেই ঐশী প্রেমের স্ফুলিঙ্গ ছাড়া আর কিছুই নই, তখন আমরা অন্যদের ভিন্নভাবে, ভিন্ন আলোতে দেখি।
ত্রয়োদশ শতাব্দীর একজন ফার্সি কবি, হাফিজ এই ভাবনাটিকে খুব সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “যদি ঈশ্বর আপনাকে একটি পার্টিতে আমন্ত্রণ জানান এবং বলেন, ‘আজ রাতের বলরুমে সবাই আমার বিশেষ অতিথি হবে’ — তাহলে আপনি যখন আসবেন তখন তাদের সাথে কেমন আচরণ করবেন? প্রকৃতপক্ষে, হাফিজ বলতে চেয়েছেন, এই পৃথিবীতে ঈশ্বরের রত্নময় নৃত্যমঞ্চে সকলেই উপস্থিত।”
অনেক বছর আগে, এসআরএফ সদস্য হওয়ার কিছুদিন পরেই, আমি লন্ডনে পড়াশোনা করতে যাই। লন্ডনে পৌঁছোনোর পর আমি প্রথমেই সেখানে এসআরএফ ধ্যান মণ্ডলীর খোঁজ করি।
সেখানে পৌঁছোবার পর আমার সাথে আর একজন মহিলার পরিচয় হয়, যিনি আমার মতোই ইতালি থেকে এসেছিলেন। তিনি খুব সুন্দরী এবং অত্যন্ত মার্জিত। আমি যখন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাই, তখন তিনি খুব উদ্ধতভাবে বলেন, “আমি কাউন্টেস অমুক।” আমি খুব মুষড়ে গেলাম। তাঁর প্রতি তাৎক্ষণিক এক বিতৃষ্ণা অনুভূত হল। তবে ধ্যান শুরু হতে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম, তাই তার সাথে আর কথা বলতে হয়নি।
অনুষ্ঠানের ঠিক পরেই, আমি দ্রুত শুভরাত্রি জানিয়ে আমার হোটেলে ফিরে আসি। আমার ঘরের দরজা খুলতেই আমি হতবাক হয়ে গেলাম। আমি আমাদের গুরু পরমহংস যোগানন্দের “শেষ হাসি” ছবিটি একটি তাকের উপর রেখেছিলাম এবং সেই মুহূর্তে তাঁকে ঠিক সেই কাউন্টেসের মতোই দেখাচ্ছিল! এমনকি তাঁর চুলও সোনালী ছিল!
কয়েক বছর পরে সেই কাউন্টেসের সাথে আবার দেখা হল, তিনি মাউন্ট ওয়াশিংটনে এসআরএফ আন্তর্জাতিক সদর দপ্তরে এসেছিলেন। ওই সময়ে আমি আশ্রমে সন্ন্যাসিনী হয়ে থাকতাম। আমি সত্যিই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং ভালোবাসা অনুভব করি, শুধুমাত্র এই কারণে নয় যে, গুরু আমাকে খুব ভালো শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাঁকে ব্যবহার করেছিলেন বরং তাঁর মুখ এবং সোনালী চুলের বাইরে তাকালে আমি পরমহংসজির দুষ্টুমিভরা চেহারা দেখতে পেতাম।
আমরা যদি সর্বদা আত্ম-উপলব্ধির পথে অন্যদেরকে আমাদের ভ্রমণ সঙ্গী হিসেবে দেখার চেষ্টা করি — এবং প্রায়শই অজান্তে ব্যক্তিগত শিক্ষক হিসেবে মেনে নিই, তাহলে আমরা তাদের আরও সহজেই ভালোবাসতে পারব।
তাহলে আমরা আর কি করতে পারি? ছোট ছোট জিনিস দিয়ে শুরু করুন। সকালের ধ্যানের পর কি কখনও গুরুদেবকে অনুরোধ করেছেন, যাতে তিনি সেই দিন কাউকে সাহায্য করার জন্য আপনাকে ব্যবহার করবেন। যদি আপনি আপনার হৃদয় ও মন খোলা রাখেন, তাহলে কী অসাধারণ কিছু ঘটতে পারে তা দেখে আপনি অবাক হবেন। তিনি আপনার মাধ্যমে কাজ করতে পারেন।
অন্য কাউকে খুশি করার জন্য আপনার প্রিয় কিছু দান করতে ভয় পাবেন না। যদি তা আপনার কাছে মূল্যবান কিছু হয়, তা হলেও দিতে ভয় পাবেন না। কারণ দেখা যাক, যখন আমরা (মৃত্যুর পরে) সূক্ষ্ম জগতে প্রবেশ করি, তখন আমরা আমাদের সাথে কিছুই নিতে পারি না। কিছুই না। এটি কেবল আমাদের আত্মার এগিয়ে যাওয়া। তাহলে কেন এখনই কাউকে খুশি করবেন না এবং একই সাথে কিছুটা ভালো কর্মফল পাবেন না?
কাউকে ধন্যবাদ বা প্রশংসা জানাতে অথবা নিঃসঙ্গ কাউকে ফুলের তোড়া পাঠাতে ভয় পাবেন না। অন্যদের কাছে পৌঁছোন। নিজের জন্যে না রেখে অন্যদের দিলে, ভালোবাসা আপনিই আসে।
আর অন্যদের জন্য প্রার্থনা করতে ভয় করবেন না। ধ্যানের শেষে, ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও, কয়েক মিনিট সময় নিন এবং অন্যদের জন্য প্রার্থনা করুন। প্রার্থনা খুবই শক্তিশালী। আপনিও সেইভাবে সাহায্য করতে পারেন। তারা হয়তো কখনোই জানতে পারবে না যে আপনি তাদের জন্য প্রার্থনা করেছেন, কিন্তু আপনি হয়তো তা করে তাদের জীবন বদলে দিতে পারেন।
এরপর, যখন আপনি হয়তো জানতে পারবেন যে, গুরুদেব আপনার মাধ্যমে কী করেছেন, তখন আপনি খুব খুশি হবেন — অন্যদের কাছে পৌঁছোনর এই আপাত অক্ষমতা কাটিয়ে ওঠার জন্য আপনি কিছু করেছেন জেনে খুব খুশি হবেন।
আমি এমন একজনের কথা পড়েছিলাম, যিনি সবচেয়ে চিন্তাশীল শিশু খুঁজে বের করার জন্য একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। বিজয়ী হয়েছিল চার বছরের একটি ছেলে। তার পাশের বাড়ির একজন বয়স্ক ব্যক্তি সদ্য স্ত্রীহারা হয়েছেন। ছোট ছেলেটি এই লোকটিকে তার লনে বসে কাঁদতে দেখে তার কাছে গিয়ে তার কোলে উঠে বসল।
পরে, তার মা ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “বাবুসোনা, তুমি বৃদ্ধ লোকটিকে কী বলেছিলে?” তাতে সে বলল, “কিচ্ছু না, আমি কেবল তাকে কাঁদতে সাহায্য করেছি মাত্র।”
মানুষের হৃদয়স্পর্শী এ কোনো বিশাল কর্মকাণ্ড নয়। আমরা প্রতিদিন ছোট ছোট চিন্তাশীল কাজ করতেই পারি। তাই ঈশ্বর এবং গুরুর নিকট তাঁদের ভালোবাসার জন্য প্রার্থনা করুন, যাতে আপনি অন্যদের ভালোবাসতে পারেন। তাহলে আপনার হৃদয় খুলে যাবে — এবং আপনি সকলকে একই ভালোবাসা দিতে সক্ষম হবেন এবং অন্যদের কাছে আরও সহজেই পৌঁছোতে পারবেন।
যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া/সেল্ফ — রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ বিশ্বব্যাপী প্রার্থনা চক্রে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রার্থনার গতিশীল শক্তি — আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে ঈশ্বরের অসীম শক্তির সাহায্যে আপনি কীভাবে অন্যদের সাহায্য করতে পারেন সে সম্পর্কে আরও জানতে আমরা আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।



















