“তোমার অবচেতন মনে সংকল্পের মাধ্যমে সদর্থক ভাবনার প্রতিষ্ঠা” প্রসঙ্গে পরমহংস যোগানন্দ

৯ই মে, ২০২৪

১৯৪০-এ ক্যালিফোর্নিয়ার এনসিনিটাসে পরমহংস যোগানন্দের প্রদত্ত ভাষণ “সাফল্যের জন্য সচেতন ও অবচেতন মনের প্রশিক্ষণ” থেকে নিম্নলিখিত নির্বাচিত অংশ উদ্ধৃত। সম্পূর্ণ বক্তৃতাটি যোগদা সৎসঙ্গ পত্রিকার জুলাই-সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৫ সংখ্যায় দুই ভাগে প্রকাশিত হয়েছিল এবং যোগদা সৎসঙ্গ অনলাইন লাইব্রেরিতে সম্পূর্ণ অংশ পড়তে পারবেন — পত্রিকার গ্রাহকদের জন্য অশেষ জ্ঞানের এই উৎস উপলব্ধ।

এই শক্তিপ্রদায়ী ও প্রেরণাদায়ক প্রসঙ্গের সম্পূর্ণ উপস্থাপনায় আর তাঁর যোগদা সৎসঙ্গ পাঠমালায়, পরমহংসজি শুধুমাত্র সচেতন ও অবচেতন মনের সর্বোত্তম ব্যবহার কিভাবে করা যায় তাই নয় বরং সার্থকতার জন্য কিভাবে স্বজ্ঞার মাধ্যমে অতিচেতন মনে সরাসরি সত্যের উপলব্ধিতে আত্মার সর্বজ্ঞতার প্রবেশ ঘটতে পারে — সে ব্যাপারে সর্বাধিক গভীরতার সাথে আলোচনা করেছেন।

অবচেতন মনে শক্তি ও সঠিক চিন্তাধারা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে সংকল্পের অনুশীলন আপনাকে সদর্থক চিন্তা ও মানসিক উন্নতির পরামর্শ দেয়। আধোঘুমের অবস্থা সবথেকে ভালো। ঠিক ঘুমিয়ে পড়ার আগে আর ঘুম ভাঙার ঠিক পরে অনেক বেশিভাবে অঙ্গীভূত করা যেতে পারে; ঠিক এই কারণে অনেকে “স্লিপ লার্নিং” বা ঘুমের মধ্যে অবচেতনে প্রশিক্ষণের সমর্থন করেন।

একজন ভদ্রমহিলা তার স্বামীর ধূমপানের অভ্যাস দূর করতে চেয়েছিলেন। তিনি প্রতি রাতে তার স্বামীর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে স্বগতোক্তি করতে থাকতেন: “দিন দিন, তুমি সর্বতোভাবে ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করছ।” তবে তার স্বামী তখনও পর্যন্ত ঘুমোতে যাননি। যতক্ষণ পারতেন তাকে সুস্থ করতে স্ত্রীর প্রচেষ্টা সহ্য করে শেষে চেঁচিয়ে উঠতেন, “আশ্চর্য, আমি ভালো হতে চাই না !” তাই, যখন তুমি কারো ভালো অভ্যাসের জন্য প্রস্তাব রাখছ, নিশ্চিত হয়ে নাও যে, হয় তিনিও ইচ্ছুক অথবা সুনিদ্রামগ্ন!

ব্যাপারটা এইরকম: তুমি সংকল্প গ্রহণের সময় তোমার অবচেতন মনে পরস্পরবিরোধী ভাবনা যেন একদম না থাকে। তুমি যাই সংকল্প করছ না কেন, সমস্ত নেতিবাচক ভাবনা ঝেড়ে না ফেলা পর্যন্ত তোমাকে মনে মনে অবশ্যই তার পুনরুক্তি করে যেতেই হবে। তোমার চেতনা ওই ভাবনার সাথে একাকার হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত বার বার তোমার সংকল্পের পুনরাবৃত্তি করতে থাকো।

উদাহরণ স্বরূপ, ধরা যাক তুমি অসুস্থ আর তোমার আরোগ্যের প্রয়োজন। তুমি দৃঢ়তার সাথে ভাবতে পারো “সুস্বাস্থ্য আমার সমস্ত কোশে কোশে প্রবাহিত হচ্ছে।” একই সময়ে তোমার অবচেতন মনের এক অনুভূতি বলে উঠবে, “তোমার শেষ, আর তুমি স্বাস্থ্যবান হতে পারবে না!” তোমার অবচেতন মন তোমাকে এভাবে নিরস্ত করা সত্ত্বেও যদি তুমি সুস্বাস্থ্যের সংকল্প আঁকড়ে থাকতে পারো, তবেই নেতিবাচক চিন্তার অবচেতন অভ্যাস শেষমেশ পরিত্যাগ করতে পারবে আর সুস্বাস্থ্যের জন্য এক নতুন মানসিক ধারা গড়ে তুলতে পারবে। তাহলেই তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে কারণ শক্তিশালী অবচেতন মনই শরীরের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্গঠনের সমস্ত অভ্যন্তরীণ জীবনপ্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

তুমি পেতে চাও এমনকিছু অর্জন করতে প্রতিরাতে শুতে যাবার আগে খুব গভীরভাবে সংকল্প করো। তুমি যদি ঈশ্বরকে চাও, প্রতিরাতে একটাই সংকল্প করো:”আমি আর আমার পিতা এক।” ঈশ্বরের জন্যে প্রার্থনা করলে তুমি সবকিছুর জন্যেই প্রার্থনা করছ। ঈশ্বর তোমার প্রয়োজন জানেন। তুমি যদি কান ধরে টানো, তার সাথে মাথাও আসে। ঈশ্বরের খোঁজে তোমার সকল সঙ্গত প্রত্যাশার সম্পূর্ণ পূর্ণতা আসবে।

তোমার অবচেতনে সন্দিহান মন হয়ত বলবে, “ওহ, ধ্যানের প্রয়োজনটাই বা কি? আমি ধ্যান করেছি, কিন্তু ঈশ্বর আমার কাছে আসেন নি।” আমাকে ওই জঘন্য চিন্তা-প্রতিবন্ধকতার সাথে লড়াই করতে হয়েছে। তবে আমি ধ্যানে যত্নশীল ছিলাম দেখে যতক্ষণ না ওই ব্যর্থতার ভাবনা দূর হয়েছে, সচেতন ইচ্ছেশক্তি ও বারংবার সংকল্প আমার অবচেতন মনকে প্রতিরোধ করেছে, তারপর সমাধির পরমানন্দের মহিমায় ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশ করেছেন।

 

এই শেয়ার করুন