স্থিরতা এবং পরম শান্তিতেই ঈশ্বরের দেখা পাওয়া যায় — শ্রীশ্রী পরমহংস যোগানন্দ

১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

নীচের অংশটি “কাল্টিভেট ফ্রেন্ডশিপ উইথ গড” শীর্ষক আলোচনা থেকে নেওয়া হয়েছে। পরমহংস যোগানন্দের কলেক্টেড টকস অ্যান্ড এসেস-এর চতুর্থ খণ্ড, সলভিং দ্য মিস্ট্রি অফ লাইফ —এ এই পুরো প্রবন্ধটি পড়া যাবে — যা হার্ডব্যাক, পেপারব্যাক এবং ই-বুক সংস্করণে এখন পাওয়া যাচ্ছে।

লোটাস্-অরেঞ্জ-লাইনআর্ট

সব সময় মনে রাখবে: যখনই সামান্য অবসর সময় পাবে, তা ঈশ্বরের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে কাজে লাগাবে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া এটি তোমাদের প্রতি এক বিনীত পরামর্শ…।

ঈশ্বরের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে হলে, তাঁকে ভালোবাসতে হলে, আমাদের আগে তাঁর সাথে পরিচিত হতে হবে। গভীর স্থিরতায় ও শান্ত মনে নিজের আত্মাকে তাঁর চরণে সমর্পণ করো।

মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই আমি তোমাদের বেদ এবং অন্যান্য শাস্ত্রের জ্ঞান-সমৃদ্ধ বাণী থেকে ঈশ্বর সম্বন্ধে অনেক কিছু হয়তো শিখিয়ে দিতে পারি; কিন্তু যতক্ষণ না তুমি নিজের অন্তরাত্মার গভীরে সেই সত্যকে উপলব্ধি করছ, ততক্ষণ এ সবে তোমার খুব একটা উপকার হবে না।

কেবল অন্তরের প্রশান্তিতেই ঈশ্বর-উপলব্ধি সম্ভব। প্রশান্তি ঈশ্বরের অত্যন্ত প্রিয়। এই প্রশান্তিই হল পরমপিতর পবিত্র বেদী এবং মন্দির। তাই শান্ত মনে তাঁকে খোঁজার অভ্যাস করো। ধ্যানই হল সেই পরম পথ। এটাই তোমাদের জন্য আমার সেরা উপদেশ। তোমরা অনেক বই পড়তে পার, ক্লাসে যেতে পার কিংবা বড় বড় দার্শনিক ব্যাখ্যা শুনতে পার, কিন্তু এই কথাটি কখনো ভুলো না: তোমার প্রতিটি অবসর মুহূর্তকে ধ্যান করতে এবং ঈশ্বরের সাথে গভীর মৈত্রীর বন্ধন গড়ে তুলতে কাজে লাগাতে হবে।

ধ্যানের প্রথম কয়েক মিনিট তোমার মন এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াবে, কিন্তু ধৈর্য হারিও না; যতক্ষণ না তোমার চিন্তাগুলো স্থির হচ্ছে ততক্ষণ চেষ্টা চালিয়ে যাও। তোমার মনে হতে পারে: “ওহ, আজ তো আমার অনেক কাজ আছে; বরং আজ রাতে কোনো এক সময় ধ্যান করে নেব।” যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি ঈশ্বরকে জানার পরম গুরুত্ব মনে-প্রাণে অনুভব করবে, ততক্ষণ “আজকের রাত” আর কোনোদিন আসবে না; নানা জাগতিক ব্যস্ততা তোমার সকাল, দুপুর এবং সন্ধ্যাকে এমনভাবে ভরিয়ে রাখবে যে, রাত হলে তুমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমের কাছে আত্মসমর্পণ করবে।

তাই যখন তুমি ধ্যানে বসবে, মনকে পুরোপুরি একাগ্র রেখো। মনের সব আজেবাজে চিন্তা দূরে সরিয়ে দাও এবং জেদ ধরে বলো — “হে পরমপিতা, আমার সাথে থাকো। আমি তোমার উত্তর পেতে চাই; আমার অন্তরের গভীরে তোমার কৃপা অনুভব করতে চাই।” বারবার তাঁকে এই কথাটি বলো, আর প্রতিবার যেন তোমার সেই ডাক আরও গভীর হয়।

মনোযোগহীনভাবে প্রার্থনা করে খুব একটা লাভ হয় না — যেমন মুখে বলছ, “হে স্বর্গস্থ পরমপিতা, আমি তোমাকে ভালোবাসি” — অথচ মনে মনে সুস্বাদু কোনো কেক খাওয়ার কথা ভাবছ। প্রার্থনার প্রথম শব্দটি, “পিতা,” যখন বলবে, তাই যথেষ্ট; কিন্তু শব্দটি ততক্ষণ বলতে থাকো যতক্ষণ না নিজের হৃদয়ে তা অনুভব করছ। তারপর প্রার্থনার পরবর্তী অংশে এগিয়ে যাও।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে এটি একটি অন্যতম পার্থক্য। উদাহরণস্বরূপ, আমি যখন প্রথম আমেরিকায় আসি, তখন পাশ্চাত্য সংগীত আমাকে খুব একটা টানেনি; কিন্তু এখন আমি এটা বুঝতে পারি — কীভাবে একটা গল্পের মতো এটা ধীরে ধীরে চরম পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। আমাদের প্রাচ্যে আমরা সংগীতকে এভাবে ব্যবহার করি না; আমরা কেবল একটি পদ বা কলি বেছে নিই এবং বারবার সেটিই গেয়ে চলি, যতক্ষণ না আমরা সেই সুরের গভীরে সম্পূর্ণ হারিয়ে যাই।

ঈশ্বরের প্রতি মনে কোনো ভালোবাসা না রেখে প্রার্থনার আস্ত একটা বই মুখস্থ বলে যাওয়ার কী মূল্য আছে? প্রকৃত প্রার্থনা কেবল বুদ্ধি দিয়ে বিচার করা নয়; বরং তুমি ঈশ্বরকে যা বলছ তা হৃদয়ে অনুভব করা। এই দিব্য অনুভূতিকে চর্চার মাধ্যমে জাগিয়ে তুলতে হয়। শুরুতে হয়তো তুমি ঈশ্বরের প্রতি তেমন ভালোবাসা অনুভব করবে না, কারণ তুমি তাঁকে এখনো চেনো না।

আমাদের কাছের এবং প্রিয়জনদের আমরা ভালোবাসি। তাদের কাছে আমাদের মনের অনুভূতিগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশ পায়; আমাদের হৃদয় থেকে তা স্বতঃস্ফুর্তভাবে উথলে ওঠে। কেন এমন হয়? কারণ তারা আমাদের কাছে বাস্তব, আমরা তাদের চোখের সামনে সরাসরি অথবা মনের আয়নায় দেখতে পাই। কিন্তু ঈশ্বরকে আমরা দেখতে পাই না, কারণ আমরা তাঁকে জানার প্রকৃত চেষ্টা করিনি। ফুলের মাঝে কিংবা প্রকৃতির অন্যান্য সৌন্দর্যের মধ্যে আমরা তাঁর অস্তিত্বের আভাস পেতে পারি; কিন্তু তাঁর সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে হলে প্রয়োজন গভীর ধ্যানের….

ঈশ্বরকে না পাওয়া পর্যন্ত অধ্যবসায় চালিয়ে যাও

আমার পরমপিতার জন্য আমি যে ভালোবাসা অনুভব করি, তার একটি ক্ষুদ্র কণা বা স্ফুলিঙ্গও যদি তোমাদের হৃদয়ে জাগিয়ে দিতে পারি, তবেই আমার কাজ সার্থক হবে।

তাঁর (ঈশ্বরের) সাথে পরিচিত হতে আমার অনেকটা সময় লেগেছিল; আমার মনে হতো এই জীবনে বুঝি আমি সফল হতে পারবো না, কারণ মন ছিল অত্যন্ত চঞ্চল। কিন্তু মন যতবারই ফাঁকি দিয়ে আমাকে ধ্যানের অভ্যাস ছাড়িয়ে দিতে চেয়েছে, আমি তার চেয়েও বড় ফাঁকি দিয়ে মনকে বলেছি — “যতই গোলমাল বা বাধা আসুক না কেন, আমি এখানেই বসে থাকব। এই প্রচেষ্টায় যদি মৃত্যুও হয়, তাতেও আমার কিছু যায় আসে না; আমি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়েই যাব।”

এইভাবে নিষ্ঠার সাথে সাধনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম আর মাঝে মাঝে সেই পরমাত্মার এক ঝলক দেখা মিলতো; অনেকটা আগুনের ফুলকির মতো — যা খুব কাছে মনে হলেও থাকতো যেন অনেক দূরে, এই দেখা দিয়ে আবার মিলিয়ে যেত। কিন্তু আমি আমার সঙ্কল্পে অটল ছিলাম। সেই অদৃশ্য নিস্তব্ধতার মাঝে অসীম ধৈর্য আর দৃঢ়তা নিয়ে আমি কত যে অপেক্ষা করেছি! আমার একাগ্রতা যত গভীর হতে লাগল, তাঁর সান্নিধ্যের আশ্বাসও তত স্পষ্ট আর জোরালো হয়ে উঠল। এখন তিনি সবসময় আমার সাথে থাকেন…।

আমি তোমাদের অন্তরে কেবল সেই দিব্য সম্পর্কের বিকাশ ঘটাতে চাই, যেখানে প্রতিবার যখন তুমি বলবে, “ঈশ্বর, আমি তোমাকে ভালোবাসি,” তখন তোমার দেহের প্রতিটি কোশ, প্রতিটি অনুভূতি এবং প্রতিটি চিন্তা তাঁর অনন্ত পরমানন্দে নেচে উঠবে।

লোটাস্-অরেঞ্জ-লাইনআর্ট

পরমহংস যোগানন্দের কালেক্টেড টকস অ্যান্ড এসেস অন রিয়লাইজিং গড ইন ডেইলি লাইফ সিরিজ -এর চতুর্থ খণ্ড, সলভিং দ্য মিস্ট্রি অফ লাইফ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার জন্য আমরা আপনাকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। শাশ্বত জ্ঞানের এই অপূর্ব গ্রন্থটি এখন সংগ্রহের জন্য উপলভ্য। 

এই শেয়ার করুন