এই ব্লগ প্রকাশনীটি ২০১১ থেকে ২০১৭-তে তাঁর মহাপ্রয়াণ পর্যন্ত যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া/সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ-এর সঙ্ঘমাতা এবং চতুর্থ অধ্যক্ষ পদে সেবারত শ্রী মৃণালিনী মাতা-র লেখা প্রবন্ধ “আধ্যাত্মিক অধ্যয়নের বিজ্ঞান এবং আত্মবিশ্লেষণের কৌশল” থেকে উদ্ধৃত যা যোগদা সৎসঙ্গ পত্রিকার জানুয়ারি – মার্চ, ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
আমরা কয়েকজন অল্পবয়সী শিষ্যা এনসিনিটাসে [আশ্রমে] থাকতাম; এবং যখন গুরুদেব [পরমহংস যোগানন্দ] এক রবিবার অন্তর সকালে সান ডিয়েগো মন্দিরে (এবং পর্যায়ক্রমে লস অ্যাঞ্জেলস-এর হলিউড মন্দিরে) তাঁর বক্তৃতা দিতেন, আমরা সেখানে উপস্থিত থাকতাম।
তাঁর বক্তৃতা দেওয়ার সময় অথবা ক্লাস নেওয়ার সময় তিনি আমাদের নোট নিতে উৎসাহিত করেছিলেন। এবং তারপর সেই সপ্তাহের প্রতি সন্ধ্যায় আমরা আশ্রমের বৈঠকখানায় অথবা ভোজন কক্ষের টেবিলে একত্রিত হতাম এবং আমাদের নোটগুলির আলোচনা করতাম।
তাঁর বক্তৃতা থেকে আমাদের প্রত্যেককে স্মৃতিচারণ করে বলতে হত এবং তারপরে আমরা তার ওপর আলোচনা করতাম। এরপর আমরা প্রত্যেকে তাঁর শিক্ষা নিজের মতো করে পুনরায় লিখতাম। এবং আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে ঠিক করতাম কীভাবে আমরা এই শিক্ষাকে নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে পারি।
সুতরাং, গুরুদেবের সৎসঙ্গের পর পুরো এক বা দুই সপ্তাহ একটি ক্লাসের ওপর আমরা ব্যয় করতাম। এটা আমাদের শুধুমাত্র গুরুদেবের জ্ঞান এবং নির্দেশনা বুঝতেই সাহায্য করত না, প্রয়োগ করার পন্থাও শেখাত।
গুরুদেব কখনও যদি পরের সপ্তাহেই এনসিনিটাসে ফিরে আসতেন, তিনি সরাসরি সেই ঘরে চলে আসতেন যেখানে আমরা পাঠের ওপর আলোচনা করতাম। গুরুদেবের সামনে “বিদ্যেবুদ্ধি” জাহির করতে স্বভাবতই আমাদের লজ্জা করত!
তিনি কিন্তু বসে পড়তেন এবং বলতেন, “না, না, থেমো না, চালিয়ে যাও।” আমরা যা যা শিখেছি, তা গুছিয়ে বলার প্রয়াস দেখে তিনি খুব খুশি হতেন। আমাদের ধীশক্তি জানার জন্য তিনি স্কুলের শিক্ষকের মতো আমাদের প্রশ্ন করতেন: “বল তো, আমি এই ব্যাপারে কী বলেছিলাম?” অথবা “ওই ব্যাপারে আমি কী বলেছিলাম?” “আমার ব্যবহৃত ওই শব্দটার মানে কী?”
আমি মানছি যে আমরা সবকিছু হৃদয়ঙ্গম করতে পারতাম না! সেই জন্য আমরা যখন সৎসঙ্গে যেতাম, তিনি আমাদের মতো ছোটো আশ্রমিকদের মন্দিরের প্রথম পংক্তিতে বসাতেন। এবং তাঁর বক্তৃতার মাঝে কোনো গভীর অথবা জটিল দার্শনিক তথ্য এলে তিনি বক্তৃতা বন্ধ করে মঞ্চ থেকে আমাদের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করতেন: “তোমরা বুঝতে পেরেছ তো?”
সভায় উপস্থিত শ্রোতৃমন্ডলী হয়তো বিস্ময় বোধ করত, “উনি কার সাথে কথা বলছেন?” অথবা “উনি যা বলছেন সেটা এই শিশুরা কী বুঝবে?”
সেই সময় প্রকৃতপক্ষে তিনি দ্বিবিধ ভূমিকা পালন করতেন: তাঁর চরণতলে স্থিত ছোটো ছোটো শিষ্যদের কাছে এক গুরুর ভূমিকা, আবার শ্রোতৃমণ্ডলীর কাছে সত্য উদ্ঘাটনে জগদগুরুর দায়িত্ব।
আমাদের সাথে থাকার সময় গুরুদেব আমাদের শাসনে রাখতেন। আমরা কোনো ভুল করলে দু-একটা কথার মাধ্যমে অথবে নীরবে শুধু চোখের অর্থপূর্ণ দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে জানিয়ে দিতেন। তিনি আমাদের বোঝাতেন সঠিক আচরণের জন্য কি করণীয়।
আমাদের এই বিষয়গুলি বোঝাবার জন্য আজ তিনি সশরীরে উপস্থিত নেই। কিন্তু, তিনি আমাদের বলেছিলেন, “যখন আমি থাকব না, আমার শিক্ষাই হবে গুরু। এসআরএফ [ওয়াইএসএস] শিক্ষাক্রমের মাধ্যমেই তোমরা আমার সঙ্গে এবং আমাকে প্রেরণকারী পরমগুরুগণের সাথে একাত্ম হতে পারবে।”
এবং আজ আমি বুঝতে পারি ওই কথাগুলি কত অর্থপূর্ণ, কারণ আমরা যখন পরমহংসজির বই এবং এসআরএফ [ওয়াইএসএস] পাঠমালা পড়ে তাঁর শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করি, তখন দেখি এগুলি শুধু নিরন্তর অনুপ্রেরণামূলক উৎসই নয়, এইগুলি আমাদের ব্যক্তিগত নির্দেশিকা এবং পরামর্শ প্রদানকারী।
আমরা দেখেছি যে যখন আমাদের প্রকৃতই পথনির্দেশের প্রয়োজন হত, যখন আমাদের বিক্ষিপ্ত করার উদ্দেশ্যে প্রক্ষিপ্ত মায়ার প্রভাব থেকে আমাদের সুরক্ষার প্রয়োজন হত, তখন গুরুদেবের শিক্ষা এবং তাঁর বাণী আমাদের সাহায্য করত যদি আমরা তাদের একান্ত আপনার করে রাখতাম।
নিম্নে বর্ণিত লিংকের মাধ্যমে আপনারা পরমহংস যোগানন্দের ধ্যানবিজ্ঞান এবং সম্যক আধ্যাত্মিক জীবনযাপনের ওপর আধারিত সর্বাঙ্গীন ঘরে-বসে পাঠের পাঠক্রম যোগদা সৎসঙ্গ পাঠমালায় বিশদ রূপে অবহিত হতে পারেন। ক্রিয়াযোগ ধ্যান এবং সম্যক জীবনযাপন প্রণালী সমন্বিত পাঠমালা-কে পরমহংসজি তাঁর শিক্ষাক্রমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছেন — যার সাহায্যে শিক্ষার্থীরা তাঁর শিক্ষা থেকে সরাসরি জ্ঞান আহরণ করা ছাড়াও আধ্যাত্মিকতার পথে ব্যক্তিগত পথনির্দেশ পেতে পারে।

















