কোথায় পাবেন চিরন্তন নিরাপত্তা? —পরমহংস যোগানন্দ

১৭ই মে, ২০২৫

নিচের পোস্টটি “ঈশ্বর-সংযোগ: মানুষের সর্বাধিক প্রয়োজন” শীর্ষক আলোচনার একটি অংশ, যা পরমহংস যোগানন্দের কালেক্টেড টকস্ অ্যান্ড এসেজ পুস্তকের চতুর্থ খণ্ডে সলভিং দ্য মিস্ট্রি অফ লাইফ অধ্যায়ে সম্পূর্ণরূপে পড়া যাবে — এটি শীঘ্রই সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ এবং পরে যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া দ্বারা প্রকাশিত হবে। সম্পূর্ণ বক্তৃতাটি ৭ই জানুয়ারী, ১৯৪০-এ ক্যালিফোর্নিয়ার এনসিনিটাসে অবস্থিত সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ গোল্ডেন লোটাস টেম্পলের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপনে দেওয়া হয়েছিল

এই পৃথিবীতে ত্রুটিবিচ্যুতি সবসময় থাকবেই। মানব জাতির উপকারের জন্য যতই বিস্ময়কর পদ্ধতি আবিষ্কৃত হোক না কেন, এই বস্তুজগৎ কখনই মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ হবে না। যদিও জিশু পাঁচ হাজার মানুষকে মাত্র কয়েকটি মাছ এবং রুটি দিয়ে খাওয়ানোর এবং এমনকি মৃতকে জীবিত করার মতো অলৌকিকতা দেখিয়েছিলেন, তবুও তাঁকে পরের ভালো করার জন্য কষ্ট ভোগ করতে হয়েছিল। তিনি নিজ শক্তির মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন যে সবকিছুই ঈশ্বরের এবং যখন আমরা আত্মার সেই অতীন্দ্রিয় চেতনাকে বাড়াতে থাকি, তখন আমরা ধীরে ধীরে পরিমিত জ্ঞানের স্তর অতিক্রম করে উপলব্ধি করি সেই একক পরম সত্তাকে, যা সকল বাহ্য প্রকাশের অভ্যন্তরে নিহিত আছে।

একমাত্র এই উপায়েই আমরা সুখী হতে পারি, যখন আমরা সুখে বা দুঃখে, সুস্থতায় বা অসুস্থতায়, জীবনে বা মরণে, জীবনের সকল দ্বন্দ্বের ভেতরেও আমরা নিজেদেরকে সত্যিই নিরাপদ এবং সুরক্ষিত মনে করতে পারি। সদা পরিবর্তনশীল ভৌত অবস্থার মধ্যে আমাদের পরিপূর্ণতা আশা করা উচিত নয়, বরং বুঝতে হবে যে একমাত্র ঈশ্বরই স্থায়ী সুখ দিতে পারেন।

মনে করুন, আপনি স্বপ্ন দেখছেন যে আপনার ভীষণ এক অসুখ করেছে, এবং সেইসঙ্গে স্বপ্নে অন্য এক শক্তিশালী সুস্থ মানুষকেও দেখলেন। আপনি আবার দেখলেন যে, আপনি দরিদ্র এবং ক্ষুধার্ত, অন্যদিকে অন্য কারো কাছে প্রচুর খাবার আছে। আপনি যখন স্বপ্ন দেখছেন, তখন আপনার বেদনা এবং ক্ষুধা বাস্তব; কিন্ত জেগে ওঠা মাত্র তা থেকে মুক্তি পেয়ে আপনি স্বস্তিতে হাসতে থাকেন।

আমরা যে স্বপ্ন জগতে বাস করি, তার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সমান সত্য। আমি সর্বদা সেটাই দেখতে পাচ্ছি। বাহ্যতঃ আমাকে এই মায়ার স্বপ্ন রাজ্যে, ঈশ্বরের কর্মসাধনে, ভৌত জীবন ও শরীরী সীমাবদ্ধতার সাথে লড়াই করতে হবে; কিন্তু ঈশ্বর-চেতনার অভ্যন্তরীণ জাগ্রতাবস্থায় আমি অবিরাম পরমানন্দ এবং নিঃশর্ত স্বাধীনতা উপভোগ করে চলেছি।

এই পৃথিবীর সকল দ্বৈততা ঈশ্বরের পরীক্ষা। তিনি চান আমরা যেন নশ্বর জীবনের মায়া থেকে জেগে উঠি, আমাদের অমরত্বের চেতনায় জেগে উঠি। এমনকি সাধু-সন্তরাও রেহাই পান না; তাদেরকেও অনেক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেন্ট ফ্রান্সিসের জীবনটাকেই দেখুন — অন্যদের আরোগ্য করার সময়ও তিনি কীভাবে কষ্ট পেয়েছিলেন, কিন্তু নিজের আরোগ্যের জন্য কখনও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেননি। প্রতি রাতে তিনি জিশু খ্রিস্টকে দেখতেন। তিনি ইন্দ্রিয়জ অভ্যাস নিয়ে জন্মগ্রহণ করেও ঈশ্বরের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার চরম শিখরে উন্নীত হয়েছিলেন।

ঈশ্বর আমাদের প্রশংসা দ্বারা নয়, বরং আমাদের ভালোবাসা দ্বারা অনুপ্রাণিত হন

অলৌকিক কাজ করার ক্ষমতা থাকলেই কেউ সাধু হয়ে যায় না। এই ধরণের কীর্তি ঈশ্বরকে মুগ্ধ করে না; তিনি এই জটিল এবং বিস্ময়কর সৃষ্টির সবকিছুতেই সর্বদা অলৌকিকত্ব ঘটিয়ে চলেছেন। তিনি কেবল আমাদের ভালোবাসায় আগ্রহী। ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসায় আপনার হৃদয়কে পবিত্র করাই সবচেয়ে বড়ো অলৌকিক কাজ; আর অন্য কিছু আপনার আত্মাকে সম্পূর্ণরূপে তৃপ্ত করতে পারবে না।

ঈশ্বর স্তুতি বা প্রশংসা দ্বারাও প্রভাবিত হন না, কারণ তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার নেই। যখন আপনি অপরের মনোযোগ কামনা না করে কেবল সত্যনিষ্ঠ আত্মাদের প্রতি আগ্রহী হন যারা আপনাকে ভালোবাসে, যখন আপনি প্রকৃত বন্ধুত্বের অর্থ উপলব্ধি করেন, যখন আপনি চাটুকারিতার কথায় নয়, বরং কেবল হৃদয়ের প্রকৃত ভালোবাসায় প্রভাবিত হন — তখন আপনি জানতে পারেন ঈশ্বর আপনার থেকে কী ধরনের প্রেম চান এবং আপনাকে কী দেন।

সেইজন্য এই ধরণের মন্দির গুরুত্বপূর্ণ — যাতে আমরা সকলেই ধর্মের বাহ্যিকতাকে ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করতে পারি। মহান জিশু খ্রিস্ট, বাবাজি, লাহিড়ী মহাশয় এবং আমার গুরু গির্জাকে খ্রিস্টিয় গোঁড়ামির প্রভাব থেকে রক্ষা করতে এবং প্রকৃত খ্রিস্টধর্ম ফিরিয়ে আনতে একত্রে আলোচনা করেন। এই কারণেই আমি এখানে আপনাদের সেবা করার জন্য এসেছি। এই শিক্ষাই হবে প্রতিটি জীবের মুক্তিদাতা। বিশ্বের সমস্ত সুবিধাজনক আবিষ্কার আপনাকে সুখী বা তৃপ্ত করতে পারবে না। প্রাচ্য থেকে এখানে এসে, আমি প্রথমে আমেরিকার উদ্ভাবনী যন্ত্র এবং বস্তুতান্ত্রিক অগ্রগতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম; কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি যে এই জিনিসগুলি আপনাদের শান্তি এবং পরিতৃপ্তি এনে দেয়নি। প্রকৃত শান্তি এবং তৃপ্তি রয়েছে ঈশ্বরানন্দে।

ভগবৎ চৈতন্যের চিরন্তন নিরাপত্তায়, মায়াস্বপ্নের অতিক্রান্ত ভূমিতে মৃত্যু, ব্যাধি, কোনো সমস্যাই কখনও প্রবেশ করতে পারবে না। সেই আশ্রয়ে নিজে নোঙরবদ্ধ থাকুন। গভীর, নিয়মিত ধ্যানের মাধ্যমে সেই চেতনায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলে সেখানেই আপনি ঈশ্বরকে পাবেন।

এই শেয়ার করুন