সর্বপ্রথম ঈশ্বরসন্ধানের মাধ্যমেই সার্থকতা লাভ হয় — শ্রী দয়ামাতা

১ আগস্ট, ২০২৬

এই বার্তায় শীঘ্রই প্রকাশিতব্য বক্তৃতামালা জার্নি উইথ পরমহংস যোগানন্দা গ্রন্থের একটি অধ্যায় “দ্য মেনি আসপেক্টস অফ গড” থেকে একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরা হয়েছে। শ্রী দয়ামাতা ১৯৫৫ থেকে তাঁর মহাপ্রয়াণ ২০১০ পর্যন্ত যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া/সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ-এর অধ্যক্ষ ও সঙ্ঘমাতার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর করুণাময়ী ও উৎসাহব্যঞ্জক পরামর্শ এবং আধ্যাত্মিকতাকে কীভাবে সর্বাঙ্গীনভাবে জীবনে প্রয়োগ করতে হয় তার এক উচ্চাঙ্গের আদর্শ—পরমহংস যোগানন্দজির শিক্ষার অনুগামীদের দ্বারা বিশ্বজুড়ে দীর্ঘকাল ধরে সমাদৃত হয়ে আসছে।

লোটাস-অরেঞ্জ-লাইনআর্ট

আধ্যাত্মিক পথে নিবেদিত আমার নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকালে আমার মনে হয় না অন্য কোনো সাধনার পুরস্কার ঈশ্বর সাধনায় পাওয়া এই গভীর শান্তি আর আনন্দ — এই সুখ, নিরাপত্তা আর উপলব্ধির সাথে তুলনীয় হতে পারে। এর অর্থ এমন নয় যে আমি বিশ্বাস করি যে, ঈশ্বরকে খুঁজে পেতে প্রত্যেককে সংসার ত্যাগ করে গুহা বা আশ্রমের নির্জনতায় থাকতে হবে। একেবারেই নয়। পরমহংস যোগানন্দ আমাদের শিখিয়েছেন যে, ত্যাগের প্রকৃত রূপ কেবলমাত্র সন্ন্যাসীর বেশধারণের মধ্যে নয় বরং ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্মতা স্থাপনের সাধনায় নিহিত।

এর জন্য নিজের কর্তব্য ত্যাগ করার প্রয়োজন পড়ে না। ঈশ্বর এই বিশ্বে আমাদের প্রত্যেককে কিছু কর্তব্য দিয়েছেন, তাঁর ইচ্ছা আমরা তা পালন করি। যেখানেই আমাদের স্থান দেওয়া হোক না কেন আমাদের দায়িত্ব পালন করা কর্তব্য, তবে একটা কথা অন্তরে উপলব্ধি করে “হে প্রভু, প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি অবস্থাতে তুমিই আমার সঙ্গী। এমনকি সব কর্তব্য-কার্যের মাঝেও তোমাকেই আমি খুঁজি, তুমিই আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।” প্রকৃত ত্যাগীর জীবনযাপন এমনটাই হয়। পরমহংসজি যেমন বলেছেন, “তোমার হৃদয় হোক এক সাধনালয় আর বসন হোক ঈশ্বরপ্রেম।”

আমাদের জীবনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দুঃখ দেয় আর সব সমস্যার কারণ তা হল অপূর্ণ বাসনা। আমরা ভালোবাসা চাই আর তাই ভালোবাসায় ব্যর্থ হলে দুঃখ পাই। আমরা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা খুঁজি, না পেলে অভাবের যন্ত্রণা অনুভব করি। স্বাস্থ্য, সুখ, শান্তি, প্রজ্ঞা, অনিশ্চয়তার মাঝে নিরাপত্তা — এই সব বাসনার অপূর্ণতা মানুষের দুঃখ-কষ্টের কারণ হয়ে ওঠে। ঈশ্বরসন্ধানই এইসব হতাশা অবসানের পথ। খ্রিস্ট কি বলেননি, “তোমরা আগে ঈশ্বরের সাম্রাজ্য আর তাঁর ন্যায়নিষ্ঠার খোঁজ করো এইসব কিছুই তোমাদের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে”?* এই আদর্শই আমি সর্বদা সামনে রেখে চলেছি।

নিজের কর্তব্য অথবা জীবনধারা যেমনই হোক না কেন, তাঁকে সর্বাগ্রে রাখাটাই ঈশ্বরসন্ধানের পথ। তিনিই প্রকৃত ত্যাগী যাঁর আর সব কামনা-বাসনা, আমাদের সকল আকুলতার পরম পরিপূর্ণতা সেই ঈশ্বরপ্রাপ্তির পরম বাসনা ও প্রয়াসের মাঝে লীন হয়ে থাকে। আমরা যখন ঈশ্বরের জন্য অন্তর থেকে সব ত্যাগ করে হৃদয় শুদ্ধ করি তখন প্রেম, নিরাপত্তা, আনন্দের বাসনা ত্যাগ করি না। সকল জীবের লক্ষ্য এই বাসনাগুলি আমরা খুঁজে চলি। তবে বস্তুজগৎ থেকে এগুলি পাওয়ার ভ্রান্ত আশা আমরা ত্যাগ করি আর সর্বাগ্রে ঈশ্বরসন্ধান থেকেই যে পরিপূর্ণতা আসে, তা উপলব্ধি করার সুবুদ্ধি অর্জন করি। চেতনার প্রধানতম স্তরে এমনটা রাখাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এরপর আসে আধ্যাত্মিক সাফল্য। তারপর আসে পার্থিব জগতের বেদনাদায়ক ব্যর্থতার থেকে মুক্তি।

একজন একাগ্র সাধক শুধুমাত্র ঈশ্বরের সাথে নীরব সংলাপের জন্য নিজের মাঝেই এক অন্তরাশ্রম গড়ে নেন। গুরুদেব বড় বড় মন্দির নির্মাণে কমই গুরুত্ব দিয়েছেন আর নীরবে পূজা আর দিব্য মিলনের জন্য হৃদয় ও চেতনার মাঝে ঈশ্বরের মন্দির গড়ে তোলার উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এই বিশ্ব আমাদের নিরাশ করতে পারে বা পরিত্যাগ করতে পারে, তবে যদি ঈশ্বরের সাথে আমরা একটা সুমধুর আর স্নিগ্ধ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি, আমাদের কখনই নিঃসঙ্গ বা পরিত্যক্ত অনুভব করতে হবে না। কেউ একজন প্রকৃত বন্ধু, এক প্রকৃত প্রেম, প্রকৃত মাতা বা পিতা সবসময় আমাদের পাশে আছেন। পরম সত্তাকে আপনি যে রূপেই অনুভব করুন না কেন, ভক্তের জন্যে ঈশ্বর সেই রূপেই প্রকাশিত হন।

পাদ টীকা:

* ম্যাথু ৬:৩৩ (বাইবেল)

এই শেয়ার করুন