“দিব্য সখ্যতায়” — শ্রী দয়ামাতা

১৮ নভেম্বর, ২০২৫

নিম্নোক্ত অংশটি “অ্যান অ্যান্থোলজি অফ কাউন্সেল” নামক একটি অধ্যায় থেকে নেওয়া হয়েছে। এই অধ্যায়টি ফাইন্ডিং দ্য জয় উইদিন ইউ: পার্সোনাল কাউন্সেল ফর গড-সেন্টার্ড লিভিং নামক গ্রন্থটির অন্তর্ভুক্ত। এতে শ্রী দয়ামাতা প্রদত্ত বিভিন্ন সৎসঙ্গ এবং তাঁর সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ -এর সদস্যদের উদ্দেশ্যে লেখা পত্রাবলী থেকে সংগৃহীত পথনির্দেশ ও অনুপ্রেরণামূলক বাণীসমূহ রয়েছে। শ্রী দয়ামাতা ছিলেন পরমহংস যোগানন্দজির অন্তরঙ্গ শিষ্য/ শিষ্যাদের একজন এবং তিনি ১৯৫৫ থেকে ২০১০-এ তাঁর মহাপ্রয়াণ পর্যন্ত যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া/সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ -এর তৃতীয় অধ্যক্ষ ও সঙ্ঘমাতা পদে সেবা করেছেন।

পদ্ম-কমলা-রেখাচিত্র

বহু বছর ধরে ভক্তদের কাছে লেখা গুরুদেবের অজস্র চিঠিপত্রে তিনি প্রায়ই সমাপ্তি টানতেন “ইন ডিভাইন ফ্রেন্ডশিপ” অর্থাৎ “দিব্য সখ্যতায়” এই কথাগুলি দিয়ে; এবং তিনি এই শব্দগুচ্ছটিকে সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ-এর সদস্যদের কাছে পাঠানো তাঁর চিঠিপত্রের একটি প্রথাগত সমাপনী সম্ভাষণের জন্য বেছে নিয়েছিলেন।

তিনি প্রায়ই আমাদের বলতেন যে, দুটি আত্মার মধ্যে যে সর্বোচ্চ এবং পবিত্রতম সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে, তা হল বন্ধুত্বের। এর মধ্যে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

তিনি সাধারণ জাগতিক বন্ধুত্বের কথা বলতেন না; তিনি বুঝিয়েছিলেন সেই শর্তহীন বন্ধুত্বের কথা, যা জিশুখ্রিস্ট তাঁর শিষ্যদের প্রতি পোষণ করতেন এবং যা তাঁরা তাঁদের গুরুর প্রতি ও একে অপরের প্রতি অনুভব করতেন। এটি ব্যক্তিনিরপেক্ষ, অথচ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একটি সম্পর্ক। এটি এই অর্থে উন্মুক্ত যে, এখানে একজন মানুষকে তার সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি সহ, সে যেমন ঠিক তেমনই, গ্রহণ করা হয় শর্তহীনভাবে।

যদি মতের পার্থক্য দেখা দেয়, তবুও একজন বন্ধুকে ভুল বোঝা হয় না; বন্ধুত্ব অটুট থাকে এবং সময়ের সাথে সাথে আরও মধুর হয়ে ওঠে। গুরুদেব তাঁর প্রিয় এবং ঘনিষ্ঠ ভক্তদের বলতেন: “বন্ধুত্ব হল পুরোনো সুরার মতো; সময়ের সাথে সাথে এর মাধুর্য কেবল বৃদ্ধিই পায়।”

বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব: মানবতার জন্য সর্বরোগহর মহৌষধি

আমি বিশ্বজনীন বন্ধুত্ব বা বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের আদর্শ সম্পর্কে গুরুদেবের কয়েকটি চিন্তাধারা পাঠ করতে চাই:

“‘বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব’ শুনতে খুব সাধারণ একটি শব্দগুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু এই দুটি শব্দের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সেই মহৌষধি যা এমন সমস্ত ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাধি নিরাময় করতে পারে, যেগুলি বিশ্বের জাগতিক, মানসিক, নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক সুখের অন্তরায়…। এই পৃথিবী তোমারও নয়, আমারও নয়। আমরা এখানে অল্প সময়ের জন্য আসা যাত্রী মাত্র। এই পৃথিবী ঈশ্বরের। তিনিই আমাদের পরম পরিচালক এবং তাঁর অধীনে আমাদের একটি ঐক্যবদ্ধ বিশ্ব গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিটি জাতি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করবে…। এর উপায় হল ঈশ্বরকে জানা; আর তাঁকে জানার উপায় হল তাঁর ওপর ধ্যান করা…। কেবল বিশ্ব ভ্রাতৃত্বই ঘৃণা দূর করতে এবং যুদ্ধ রোধ করতে পারে। একমাত্র বিশ্ব ভ্রাতৃত্বই সমগ্র মানবজাতির সমৃদ্ধিকে বজায় রাখতে পারে। তাই আমি তোমাদের বলি, ঈশ্বরের সাথে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে সেই ভ্রাতৃত্ববোধ নিজেদের হৃদয়ে নিয়ে এসো। ঈশ্বরের পিতৃত্ব অনুভব কর এবং বুঝতে শেখো যে প্রতিটি মানুষই তোমার আপন। যখন তুমি নিজের হৃদয়ে ঈশ্বরকে অনুভব করবে, তখন বিশ্ব সভ্যতায় তুমি এমন অবদান রাখবে যা কোনো রাজা বা রাজনীতিবিদ আগে কখনো করতে পারেননি। যাঁদের সংস্পর্শে তুমি আসবে, তাঁদের সকলকেই ভালোবেসো। দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলতে সক্ষম হও, ‘সে আমার ভাই, কারণ আমার অন্তরে যে ঈশ্বর আছেন, তিনি তার অন্তরেও বিরাজমান।’”

আজ আমাদের এই পৃথিবীর যা সবথেকে বেশি প্রয়োজন, তা হল, আরও বেশি সংখ্যক মানুষ যেন নিঃস্বার্থ প্রেম এবং দিব্য বন্ধুত্ব সকলের মাঝে বিলিয়ে দেয়; তারা যেন নিজেদের ক্ষুদ্র অহং বা আমিত্বের গণ্ডি পেরিয়ে চেতনার বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করে।

সকলকে ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব দেওয়া

মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে গুরুদেব বলেছিলেন যে, তিনি কেবল ভারতের একার নন। গুরুদেব তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং কয়েক দিন অতিবাহিত করেছিলেন; গান্ধীজি ছিলেন এক অতি সাধারণ বিনম্র মানুষ যিনি অত্যন্ত সরলভাবে জীবনযাপন করতেন এবং কেবল একটি কৌপীন পরিধান করতেন। ভারতের একজন হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন এই আধুনিক যুগের শ্রেষ্ঠতম খ্রিস্টান। তিনি বলেছিলেন: “যে আমার ভারতকে ভালোবাসে, সেই একজন ভারতীয়।” এই কথার মাধ্যমে তিনি কাউকে তাঁর ভালোবাসা থেকে বাদ দেননি। ঈশ্বর এবং নিজের জাতির প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা, তাতে তিনি সমগ্র মানবজাতিকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তিনি মানুষের আত্মার বিশ্বজনীনতাকে উপলব্ধি করেছিলেন এবং নিজের জীবনে তা প্রতিফলিত করেছিলেন।

১৯৩৫-এ ভারতের ওয়ার্ধায় মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে পরমহংস যোগানন্দ। তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে এক বছরব্যাপী সফরসূচীতে, পরমহংসজি মহাত্মা গান্ধীর আশ্রমে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। এই ছবিটি তোলা হয়েছিল একটি সোমবারে (মহাত্মার মৌন পালনের দিন) এবং ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে মহাত্মা গান্ধী এইমাত্র যে চিরকুটটি লিখেছেন, পরমহংসজি সেটি পড়ছেন।

সেই একই ভাব গুরুদেব তাঁর নিজের জীবনেও প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর কাছে কেউ অপরিচিত ছিল না। তিনি দুহাত বাড়িয়ে সকলের সঙ্গেই এক মধুর, সরল ও শিশুর মতো বিশ্বাস এবং বন্ধুত্বের সাথে মিলিত হতেন। যারা তাঁকে বুঝতে পারতো না, তাদের প্রতিও তিনি সহানুভূতিশীল ছিলেন। প্রথমে তিনি একাগ্রভাবে ঈশ্বরকে অন্বেষণ করার আদর্শটি পালন করেছিলেন; তিনি বলেন যে আমাদের নিঃসংশয় এবং নিশ্চিত হতে হবে যে আমরা ঈশ্বরেরই সন্তান এবং তিনি আমাদের হৃদয়ের গোপন ডাকে সাড়া দেন; এবং তারপর ঈশ্বরের মধ্যে যে দিব্য প্রেম ও বন্ধুত্বের সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন, যারাই তাঁর সংসর্গে এসেছেন, তাদের প্রত্যেকের মাঝে তিনি তা বিলিয়ে দেন।

পদ্ম-কমলা-রেখাচিত্র

আমরা আপনাকে দ্য স্পিরিচুয়াল এক্সপ্রেশন অফ ফ্রেন্ডশিপ সম্পর্কে জানতে আমন্ত্রণ জানাই, পরমহংস যোগানন্দের আসন্ন প্রকাশিতব্য এই গ্রন্থে প্রকৃত বন্ধুত্ব সম্বন্ধে চিরন্তন প্রজ্ঞা এবং কীভাবে এই বন্ধুত্ব আমাদের জীবন ও বিশ্বকে বদলে দিতে পারে তা উপস্থাপিত হয়েছে।

এই শেয়ার করুন