১৯৯২-তে যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া/সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ-এর তৃতীয় অধ্যক্ষ শ্রী দয়ামাতার একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল এবং ৫ জানুয়ারি, ১৯৯৩-তে পরমহংস যোগানন্দের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তাঁর জীবন ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তাঁকে একগুচ্ছ প্রশ্ন করা হয়েছিল। তাঁর উত্তরমালা ১৯৯৩-এর জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে যোগদা সৎসঙ্গ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। সেই উত্তরমালার একটি সংকলন শ্রী দয়ামাতার বক্তৃতামালার তৃতীয় সংকলন জার্নি উইথ পরমহংস যোগানন্দ গ্রন্থের একটি অধ্যায়ে প্রকাশিত হবে। এখানে আমরা তাঁকে করা প্রশ্নগুলির একটি এবং তাঁর দেওয়া গভীর প্রেরণাদায়ক উত্তর উপস্থাপন করছি।
প্রশ্ন: সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ [যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া]-র গুরুত্বপূর্ণ নীতি মনে হয় — সম্যক জীবনের তত্ত্ব — অর্থাৎ, ধ্যান সহযোগে উচিত কর্ম। পরমহংস যোগানন্দ জীবনে এই আদর্শকেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি ভ্রমণ করেছেন, সারা দেশের শহরে শহরে বক্তৃতা করেছেন, হাজার হাজার মানুষ তাঁর সাক্ষাতে এসেছেন। তথাপি তাঁর অন্তর ঈশ্বরের সাথে একাত্মতায় ডুবে থাকত। সাধারণ মানুষের পক্ষে আজকের প্রচন্ড চাপের মাঝে কি এমন সম্ভব?
পরমহংস যোগানন্দের বার্তার একটা অংশ হল, আশ্রম ও মঠেতে যাঁরা থাকেন, শুধুমাত্র তাঁদের জন্যেই ঈশ্বর-উপলব্ধি সংরক্ষিত এমন নয়। এটা সমগ্র মানবজাতির জন্যই উপলব্ধ। আপনাকে হিমালয়ের কোনো গুহায় যেতে হবে না! আপনি যেখানেই আছেন, সেখানেই তাঁকে খুঁজে পেতে পারেন। আপনার জীবন যত বেশি অস্থির, তাঁকে খুঁজে পাওয়া আপনার তত বেশি প্রয়োজন।
মহান জ্ঞানীগণ এবং গুরুগণ যেমন করেছেন, তেমন আপনিও যদি আপনার কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝে ধ্যানের জন্য সময়ের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারেন, তবে ঈশ্বরকে আপনার নিজের করে নিতে পারবেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ধ্যানের মাঝে পাওয়া তাঁর সচেতনার স্পর্শ কর্মব্যস্ততার মাঝে ধরে রাখা। সহজভাবে বললে, আপনি যা-ই করছেন না কেন, সচেষ্ট থাকুন যেন তাঁকে না ভুলে যান। তাঁকে আপনার জীবনে নিয়ে আসুন, জীবনের অঙ্গ করে তুলুন, তিনি যেন হয়ে ওঠেন এক একতার আদর্শ, আপনার সব ভাবনা ও কর্মের মাঝে প্রবাহিত হওয়া এক নীরব প্রেম।
যদিও ঈশ্বরসন্ধানী হতে গেলে সংসার ত্যাগ করতে হবে এমনটা জরুরি নয়, তবে এক শান্ত, আরও আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য ধীরতার প্রচেষ্টা দরকার। এই পৃথিবীতে আমরা কতটা অধির অবস্থায় থাকি সেটা আমরা উপলব্ধি করতে পারি বলে আমার মনে হয় না। অনেক অনেক দায়িত্ব, অনেক অনেক কাজ যখন জমা হয়ে যায় — মানুষ ভাবতে শুরু করে, “এটা অসম্ভব”! তখন নিজেই নিজেকে বলতে হয়, “শান্ত হও”। এভাবেই চলতে হয় — শান্ত হও। নিজের জীবনেও দেখেছি, নিজেকে উত্তেজিত না রেখে এইরকম অনুশীলনের প্রচেষ্টা করি বলেই অনেক কাজ করতে পেরেছি। শুধুমাত্র নিজেকে স্নায়বিক বিপর্যস্ত করে ঐরকম ভাবে থেকে কোনো লাভ নেই।
ঈশ্বরসন্ধানী হলে মনে তাড়াহুড়োর কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। ধ্যানের সময় তাড়াহুড়োর মানসিকতা থাকলে ঈশ্বরের সান্নিধ্য উপলব্ধি করার আশা বৃথা হয়। এভাবে বিশ বছর ধরে প্রতিদিন ধ্যান করলেও একটুও এগোনো যাবে না; শুধুমাত্র ধ্যানের আনুষ্ঠিকতাই হবে। ধীর হওয়া রপ্ত করতে হয় আর ঈশ্বরকে প্রেমের একাগ্রতা দিতে হয়। এটা এতটাই অপরিহার্য।
আমরা খাবার, ঘুম এবং অন্যান্য আপাত অপরিহার্য উপকরণ ছাড়া বাঁচতে পারব না বলে মনে করি, তাই এগুলির জন্যে আমরা সময় বের করে নিই। একইভাবে, আমাদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে, আমাদের মন, শরীর, আমাদের সকল কাজের জন্য যিনি শক্তি জোগাচ্ছেন — সেই ঈশ্বর ছাড়া আমরা বাঁচতে পারব না। আমরা যদি তাঁকে অবহেলা করি, আমাদের জীবনের সেই স্রষ্টা ও পালকের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলব।
কাজের জন্য যেমন সময় আছে; ধ্যানের জন্যেও সময় আছে। ঈশ্বরের জন্যে অত্যন্ত সক্রিয় হতে গুরুদেব আমাদের শিখিয়েছেন; কাজের মাঝে সময়ে সময়ে একটু থেমে নিজেদের প্রশ্ন করতে হয়, “আমার চেতনা এখন কোথায়?” আমার মন কি অন্তরমাঝে নিঃশব্দে ঈশ্বর প্রণিধানে আছে, নাকি এই ভৌতজগতে হারিয়ে গেছে? আপনি যদি ধ্যান করেন আর তারপর কাজের মাঝে মনকে ঈশ্বরকেন্দ্রিক রাখতে চান তবে স্বাভাবিকভাবেই আপনার জীবন সুষম হয়ে উঠছে। আবেগ থেকে নয় বরং অন্তরের গভীর নীরবতা থেকে পরিচালিত হয়ে — আবার একজন শান্ত মানুষ হয়ে উঠছেন।
আমরা আপনাকে ওয়াইএসএস/এসআরএফ-এর তৃতীয় অধ্যক্ষ ও সঙ্ঘমাতা শ্রী দয়ামাতার প্রেরণাদায়ক জীবন — প্রেম, মানবতা এবং ঈশ্বর ও তাঁর গুরুদেব পরমহংস যোগানন্দের সেবায় নিবেদিত জীবন সম্বন্ধে আরও জানার জন্যে আমন্ত্রণ জানাই।



















