মহাবতার বাবাজি — মহান মৃত্যুঞ্জয় যোগী — ১৮৬১-তে মনুষ্য চৈতন্যের উন্নতির জন্য তাঁর শিষ্য লাহিড়ী মহাশয়-কে ক্রিয়াযোগ প্রদান করে আত্ম-উপলব্ধির এই প্রাচীন বিজ্ঞানকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তিনি ওয়াইএসএস/এসআরএফ গুরুপরম্পরার পরমগুরু, এক দিব্য অবতার, যুগে যুগে অবতার ও ধর্মপ্রবক্তাদের ঈশ্বরপ্রদত্ত কর্ম সম্পাদনে সহায়তা করাই যাঁর উদ্দেশ্য।
বাবাজি নীরবে সমগ্র মানবজাতির আধ্যাত্মিক বিবর্তনকে পরিচালিত করে চলেছেন। যাঁরা তাঁর দর্শন লাভ করেছেন, তাঁরা বলেন, তাঁর স্বরূপ নির্মল প্রেম, আর গভীর বিনয়ই তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য। শ্রদ্ধাভরে তাঁর পবিত্র নাম উচ্চারণ করলেই তৎক্ষণাৎ তাঁর আশীর্বাদ লাভ করা যায় বলে প্রচলিত আছে।
মহাবতার বাবাজি সম্পর্কে
বদ্রীনারায়ণের নিকটবর্তী উত্তর হিমালয়ের দুর্গম শৈলশৃঙ্গ আজও লাহিড়ী মহাশয়ের পরম শ্রদ্ধেয় গুরু বাবাজির প্রাণময় উপস্থিতিতে পবিত্র হয়ে আছে। এই নির্জনবাসী মহাসাধু শতাব্দীর পর শতাব্দী, সম্ভবত সহস্রাব্দ ধরে, তাঁর একই দেহ ধারণ করে আছেন। মৃত্যুঞ্জয় বাবাজি একজন অবতার। ‘অবতার’ শব্দটি সংস্কৃত; এর অর্থ ‘অবতরণ’। শব্দটির মূল ‘অব’ অর্থাৎ ‘নীচে’ এবং ‘তৃ’ অর্থাৎ ‘অতিক্রম করা’। হিন্দু শাস্ত্রে ‘অবতার’ বলতে দিব্য সত্তার মানবদেহে অবতরণকে বোঝায়।
— পরমহংস যোগানন্দ, যোগী-কথামৃত
![]()
পরমহংস যোগানন্দের যোগী-কথামৃত গ্রন্থের মাধ্যমেই বিশ্ব প্রথমবারের মতো এক বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ, মহাবতার বাবাজি সম্পর্কে জানতে পারে। পরমহংসজি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “বাবাজির পরিবার বা জন্মস্থান সম্বন্ধে, যা ইতিহাস রচয়িতাদের কাছে এত প্রিয়, তেমন কোনো নির্দিষ্ট তথ্য কখনও আবিষ্কৃত হয়নি।” এরপর তিনি বলেন, “এক সম্পূর্ণ মুক্ত মহাপুরুষের পিতৃপরিচয় আমরা জানি কি জানি না তাতে কী কিছু আসে যায়?”
“…তিনি সাধারণত হিন্দিতে কথা বলেন, তবে যে কোনো ভাষাতেই অনায়াসে আলাপ করতে পারেন। তিনি নিজের জন্য ‘বাবাজি’ (শ্রদ্ধেয় পিতা) এই সরল নামটি গ্রহণ করেছেন; যদিও তাঁর শিষ্যরা তাঁকে ‘মহাবতার’ (মহান অবতার), ‘মহাযোগী’ বা ‘মহান যোগী’ নামেও সম্বোধন করেন।”
মহাবতার বাবাজির জন্ম ও জীবন সম্পর্কে কোনো ঐতিহাসিক নথি না থাকলেও, পরমহংস যোগানন্দ যোগী-কথামৃত-এ লিখেছেন যে, এই মৃত্যুঞ্জয় অবতার অনাদিকাল ধরে ভারতের দুর্গম হিমালয় অঞ্চলে অবস্থান করছেন এবং কেবলমাত্র অতি সৌভাগ্যবান কয়েকজনের কাছেই কখনও সখনও আত্মপ্রকাশ করেন।
এই মৃত্যুঞ্জয় গুরুর দেহে বার্ধক্যের কোনো চিহ্ন নেই। তাঁকে পঁচিশ বছরের অধিক বয়সী বলে মনে হয় না। তাঁর গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল, দেহের গঠন এবং উচ্চতা মধ্যম। তাঁর অপরূপ, শক্তিময় শরীর থেকে এক সুস্পষ্ট দিব্যজ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়। তাঁর চোখ দুটি গাঢ়, শান্ত ও স্নেহপূর্ণ; আর তাঁর দীর্ঘ, উজ্জ্বল কেশ তাম্রবর্ণের।
বাবাজি কেবল তখনই অন্যদের কাছে দৃশ্যমান হন বা তাঁরা তাঁকে চিনতে পারেন, যখন তিনি নিজে তা ইচ্ছা করেন…। ঈশ্বর দ্বারা এই নির্দিষ্ট বিশ্বচক্রের সমগ্র সময়কাল নিজ দেহে অবস্থান করার জন্য তিনি নির্বাচিত । যুগের পর যুগ অতিবাহিত হবে, তবুও শতাব্দীর এই মহালীলাকে প্রত্যক্ষ করে সেই মৃত্যুঞ্জয় মহাগুরু পৃথিবীর এই মঞ্চে বিরাজমান থাকবেন।
ভারতে বাবাজির উদ্দেশ্য ছিল এবং আজও রয়েছে ঈশ্বরের অবতারদের তাঁদের বিশেষ দিব্য কর্ম সম্পাদনে সহায়তা করা। এই কারণেই শাস্ত্র অনুযায়ী তিনি ‘মহাবতার’ (মহান অবতার) নামে অভিহিত। তিনি নিজেই বলেছেন যে, তিনি স্বামী সম্প্রদায়ের পুনর্গঠক শঙ্করাচার্য এবং মধ্যযুগের প্রসিদ্ধ মহাপুরুষ কবীর-কে যোগদীক্ষা প্রদান করেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাঁর প্রধান শিষ্য ছিলেন, যেমন আমরা জানি, লাহিড়ী মহাশয়, যিনি হারিয়ে যাওয়া ক্রিয়াযোগ সাধনার পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছিলেন।
“বাবাজির আধ্যাত্মিক অবস্থার উপলব্ধি মানববুদ্ধির সীমার অতীত। মানুষের সীমাবদ্ধ দৃষ্টি তাঁর সেই অতীন্দ্রিয় মহিমাকে ভেদ করতে পারে না। তাঁর প্রাপ্তির স্তর কল্পনা করার চেষ্টাও বৃথা। তা সত্যিই অকল্পনীয়।”
— স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বরজি যোগী-কথামৃত
“যখনই কেউ শ্রদ্ধাভরে বাবাজির নাম উচ্চারণ করে… তখনই সেই ভক্ত তৎক্ষণাৎ একটি আধ্যাত্মিক আশীর্বাদ আকর্ষণ করেন।”
— লাহিড়ী মহাশয় যোগী-কথামৃত
আমরা আপনাকে পরমহংস যোগানন্দজির অমর আধ্যাত্মিক গ্রন্থ যোগী-কথামৃত-র সেই অধ্যায়টি পাঠ করার আন্তরিক আমন্ত্রণ জানাই, যেখানে মহাবতার বাবাজির অতুলনীয় আধ্যাত্মিক গভীরতা এবং তাঁর বিশেষ ভূমিকা বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। সেই মহামহিম সত্তা সম্পর্কে আরো জানুন, যিনি মানবজাতির আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য নিরলসভাবে কর্মরত এবং যিনি ক্রিয়াযোগের পথের ভক্তদের চিরকাল সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মহাবতার বাবাজির জীবন ও শিক্ষার বিষয়ে আরও জানতে আমরা আপনাকে যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার সন্ন্যাসীদের অনলাইন বক্তৃতাগুলি দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানাই। এই বক্তৃতাগুলি ভারতের ছয়টি ভাষায় উপলব্ধ: ইংরেজি, হিন্দি, বাংলা, কন্নড়, তামিল এবং তেলুগু।
অমর ক্রিয়াযোগ গুরু: মহাবতার বাবাজি
1:07:34
1:14:14
53:59
54:07
58:58
1:07:20
ক্রিয়াযোগ-বিজ্ঞানের পুনরুদ্ধার
ক্রিয়াযোগ মানবজাতিকে প্রদত্ত ঈশ্বরলাভের অন্যতম প্রাচীন এবং সর্বাধিক কার্যকর সাধনপ্রক্রিয়া। এটি প্রত্যক্ষভাবে মেরুদণ্ডস্থিত প্রাণশক্তি—প্রাণের উপর কার্য করে এবং সাধারণ সাধনপদ্ধতির তুলনায় বহুগুণ দ্রুত আধ্যাত্মিক বিকাশ সাধন করে। গুরুদেব একে ঈশ্বরলাভের সর্বোচ্চ পথ বলে অভিহিত করেছেন। ক্রিয়াযোগ মানবজীবনের সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার মহৌষধ। অতীত যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতা-য় এবং পতঞ্জলি যোগসূত্র-তে এই সাধনপদ্ধতির মহিমা ঘোষণা করেছেন।

ভগবদ্গীতা-য় ভগবান অর্জুনকে বলেন:
“আমি এই অবিনাশী যোগ প্রথমে বিবস্বত (সূর্যদেব)-কে অবগত করেছিলাম; বিবস্বত তা মনুকে( হিন্দু আইনের স্রষ্টা) শিক্ষা দেন; মনু তা ইক্ষাকুকে (সূর্যবংশীয় ক্ষত্রিয়দের প্রতিষ্ঠাতা) প্রদান করেন। এইভাবে গুরু-শিষ্য-পরম্পরায় রাজর্ষিগণ (রাজ ঋষিরা) এই যোগের জ্ঞান লাভ করেছিলেন। কিন্তু, হে পরন্তপ (অর্জুন)! দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার ফলে পৃথিবীতে এই যোগ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।” — অধ্যায় ৪: ১–২
কিন্তু সময়ের প্রবাহে এই পবিত্র বিজ্ঞান লুপ্ত হয়ে যায়। দীর্ঘ বস্তুবাদী যুগে এই সাধনপদ্ধতি হয় গোপন রাখা হয়েছিল, নয়তো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গিয়েছিল। মুক্তিলাভের এই মহামূল্যবান চাবিকাঠি থেকে অসংখ্য আন্তরিক সাধক বঞ্চিত হয়েছিলেন।
তারপর, এই যুগে এক অসাধারণ ঘটনা ঘটল।
মহাবতার বাবাজি পুনরায় এই সাধনপদ্ধতিকে পুনরুজ্জীবিত করলেন। তিনি এই পুনরুজ্জীবনের সূচনা করার জন্য এক মহান গৃহস্থ-যোগীকে তাঁর মাধ্যম হিসেবে নির্বাচন করলেন, যাতে ক্রিয়াযোগ একইভাবে, গৃহী ও ত্যাগী সকলের কাছেই পৌঁছে যায়।
সেই গৃহস্থ-যোগী ছিলেন লাহিড়ী মহাশয়।
তবে বাবাজি তাঁকে প্রাচীন নিয়মটিও স্মরণ করিয়ে দিলেন:ক্রিয়াযোগ কেবল তাঁদেরই প্রদান করা হবে, যাঁরা ঈশ্বরলাভের উদ্দেশ্যে সর্বস্ব ত্যাগ করার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু জগতের অসংখ্য দুঃখক্লিষ্ট নারী-পুরুষের প্রতি গভীর করুণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে, যাঁরা ত্রিবিধ তাপে জর্জরিত এবং যদি ক্রিয়াযোগ তাঁদের থেকে গোপন রাখা হয়, তাঁরা হয়তো কখনও মুক্তির পথে অগ্রসর হবেন না, লাহিড়ী মহাশয় তাঁর গুরুর কাছে বিনীতভাবে প্রার্থনা করলেন যেন এই কঠোর শর্ত কিছুটা শিথিল করা হয়, যাতে অন্তরের পূর্ণ বৈরাগ্যের জন্য এখনও সম্পূর্ণ প্রস্তুত না হলেও আন্তরিক সাধকেরা ক্রিয়াযোগের মুক্তিদায়িনী কৃপা লাভ করতে পারেন।
“তাই হোক,” বাবাজি বললেন। “তোমার মাধ্যমে ঈশ্বরের ইচ্ছাই প্রকাশিত হয়েছে। যে কেউ বিনম্রভাবে তোমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে, তাকে ক্রিয়াযোগ দিও।”
বাবাজি আরও বললেন, “তোমার প্রত্যেক শিষ্যকে ভগবদ্গীতা-র এই মহৎ প্রতিশ্রুতিটি স্মরণ করিয়ে দেবে: স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াত্। অর্থাৎ, [এই ধর্মের (ধার্মিক সাধনা বাসৎকর্ম) সামান্য অনুশীলনও মানুষকে মহাভয় থেকে (মহৎ ভয়)—জন্ম-মৃত্যুর অন্তহীন আবর্তে নিহিত বিরাট দুঃখ থেকে—রক্ষা করে।]”
বিশ্বব্যাপী ক্রিয়াযোগের প্রসার
লাহিড়ী মহাশয় পুনরায় তাঁর পারিবারিক ও কর্মজীবন, সাধারণ জীবনে ফিরে এলেন। কাশীতে তাঁর গৃহ থেকেই তিনি নিঃশব্দে, কোনো প্রচার বা আড়ম্বর ছাড়াই, আন্তরিক ভক্তদের ক্রিয়াযোগে দীক্ষা দিতে শুরু করলেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ শিষ্যদের অন্যতম ছিলেন এক তরুণ, প্রিয়নাথ কড়ার, যিনি পরবর্তীকালে স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি নামে আখ্যায়িত হন।

শ্রীযুক্তেশ্বরজি ছিলেন গভীরতম আধ্যাত্মিক উপলব্ধির এক মহাগুরু—একজন জ্ঞানাবতার, বা “জ্ঞানমূর্তি,”যেমন পরমহংস যোগানন্দজি পরে তাঁকে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি এবং কঠোর আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা অসংখ্য সাধককে ঈশ্বরলাভের পথে পরিচালিত করেছিল।
১৮৯৪-তে এলাহাবাদের কুম্ভমেলায় শ্রীযুক্তেশ্বরজির সঙ্গে মহাবতার বাবাজির সাক্ষাৎ হয়। নিজের পরিচয় গোপন রেখে বাবাজি তাঁকে বলেছিলেন:
“প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকে কর্ম ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে এক সুবর্ণ মধ্যপথ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমি আমেরিকা ও ইউরোপে বহু সম্ভাবনাময় সাধুসত্তাকে দেখতে পাচ্ছি, যারা জাগ্রত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। স্বামীজি, এই ভবিষ্যৎ সৌহার্দ্যপূর্ণ আদান-প্রদানে আপনার একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কয়েক বছর পরে আমি আপনার কাছে এমন একজন শিষ্যকে পাঠাব, যাঁকে আপনি প্রশিক্ষিত করবেন যাতে তিনি পাশ্চাত্যে যোগের প্রচার করতে পারেন।”
সেই শিষ্য ছিলেন মুকুন্দলাল ঘোষ, যিনি পরবর্তীকালে পরমহংস যোগানন্দ নামে পরিচিত হন।
এইভাবেই ক্রিয়াযোগের পবিত্র আলোকশিখা আবার গুরু-পরম্পরায় প্রবাহিত হল — শ্রীযুক্তেশ্বরজি হতে সেই তরুণ সন্ন্যাসীতে, যিনি এটিকে সমুদ্রের ওপারে বহন করে নিয়ে যাবেন।
পরমহংস যোগানন্দজি শ্রীযুক্তেশ্বরজির কঠোর অথচ স্নেহময় তত্ত্বাবধানে তাঁর আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি কেবল ক্রিয়াযোগেই দীক্ষিত হননি; শ্রীযুক্তেশ্বরজির থেকে সন্ন্যাসও গ্রহণ করেন। এভাবেই তিনি গুরু-পরম্পরায় প্রবাহিত সেই অবিচ্ছিন্ন আত্মোপলব্ধির ধারা লাভ করেছিলেন।
একদিন, ১৯২০-তে, তাঁর রাঁচির আশ্রম ও বিদ্যালয়ে ধ্যানরত অবস্থায় যোগানন্দজি এক দিব্যদর্শন লাভ করেন। সেই দর্শনে তিনি উপলব্ধি করেন যে, পাশ্চাত্যে তাঁর কর্মযজ্ঞ শুরু করার সময় এসে গেছে। তিনি অবিলম্বে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরদিনই তাঁকে সেই বছরের শেষভাগে বোস্টনে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার আমন্ত্রণ জানানো হয়। শ্রীযুক্তেশ্বরজি নিশ্চিত করলেন যে সঠিক সময় উপস্থিত হয়েছে। তিনি বললেন, “তোমার জন্য সমস্ত দ্বার উন্মুক্ত। হয় এখনই, নচেৎ আর কখনও নয়।”
পাশ্চাত্যে যাত্রার অল্প কিছুদিন আগে, যোগানন্দজিকে মহাবতার বাবাজি দর্শন দেন সেই অমর মহাযোগী, যিনি এই যুগে প্রাচীন ক্রিয়াযোগ-বিজ্ঞানকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। বাবাজি যোগানন্দজিকে বললেন, “পাশ্চাত্যে ক্রিয়াযোগের বাণী প্রচারের জন্য আমি যাকে নির্বাচন করেছি তুমিই সেই । বহু বছর আগে কুম্ভমেলায় তোমার গুরু শ্রীযুক্তেশ্বরের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল; তখনই তাঁকে বলেছিলাম যে, তোমাকে তাঁর কাছে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠাব। ক্রিয়াযোগ,ঈশ্বরলাভের এই বৈজ্ঞানিক সাধনপ্রক্রিয়া,অবশেষে বিশ্বের সর্বত্র বিস্তার লাভ করবে এবং মানুষের অসীম পরমপিতার অতীন্দ্রিয় প্রত্যক্ষ উপলব্ধির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে।”
১৯২০-র সেপ্টেম্বর মাসে সেই তরুণ স্বামী বোস্টনে পৌঁছোলেন। তিনি এমন এক দেশে পদার্পণ করেছিলেন, যেখানে ক্রিয়াযোগ সম্পর্কে কেউ জানত না, ভারতের প্রাচীন আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অমূল্য ভাণ্ডারের প্রকৃত মূল্যও তখনো উপলব্ধি করেনি। কিন্তু তিনি বাবাজির সেই পবিত্র দায়িত্বকে এক বিশ্বব্যাপী মহাউদ্দেশ্যে রূপান্তরিত করলেন, যা আজও সমানভাবে কার্যকর রয়েছে।
যোগানন্দজির প্রথম বক্তৃতা ছিল আন্তর্জাতিক ধর্মীয় উদারপন্থী সম্মেলনে, যার বিষয় ছিল “ধর্ম-বিজ্ঞান” (দ্য সায়েন্স অফ রিলিজিয়ন )। তাঁর এই বক্তৃতা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে গৃহীত হয়। সেই বছরই তিনি সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ প্রতিষ্ঠা করেন, যাতে ভারতের প্রাচীন যোগবিজ্ঞান, দর্শন এবং ধ্যানের চিরন্তন ঐতিহ্য সারা বিশ্বে প্রচারিত হতে পারে।
পরমহংস যোগানন্দজি মহাবতার বাবাজির বিশ্বব্যাপী আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অব ইন্ডিয়া (ওয়াইএসএস ) এবং সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ (এসআরএফ) কে দুটি পরিপূরক মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ওয়াইএসএস ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলিতে পরমহংসজির কার্যক্রম পরিচালনা করে, আর এসআরএফ বিশ্বের অন্যান্য দেশে তাঁর এই মহান কর্মধারা বহন করে নিয়ে যায়।
পাশ্চাত্যে তাঁর উদ্দেশ্যের সূচনালগ্ন থেকেই পরমহংসজি যোগসাধনার নীতি ও প্রক্রিয়ার উপর একটি সুসংবদ্ধ পাঠক্রম প্রস্তুত করতে শুরু করেন, যাতে আন্তরিক ছাত্রছাত্রীরা মহাবতার বাবাজির নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী ক্রিয়াযোগ-দীক্ষা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি যোগদা সৎসঙ্গ/সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ লেসন্স প্রবর্তন করেন — একটি বিস্তৃত ঘরে-বসে পাঠের পাঠক্রম, যার মধ্যে ক্রিয়াযোগ ধ্যানের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সুষম জীবনযাপনের নীতিগুলিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই পাঠক্রম এমনভাবে রচিত যে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যে কোনো আন্তরিক সাধক এর মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন।
এই পাঠমালা কেবলমাত্র ডাকযোগে পাঠানো শিক্ষাসামগ্রী নয়। এর মধ্যে গুরু-পরম্পরার প্রাণবন্ত আধ্যাত্মিক স্পন্দন নিহিত রয়েছে। এর মাধ্যমে মহাবতার বাবাজি দ্বারা পুনরুজ্জীবিত যথাযথভাবে সংরক্ষিত ও বিকৃতি থেকে সুরক্ষিত ক্রিয়াযোগ তার মূল, অবিকৃত রূপেই সাধকদের কাছে পৌঁছে যায়। এভাবেই আমাদের গুরুদেব, পরমহংস যোগানন্দজি, ব্যক্তিগতভাবে মুখোমুখি সাক্ষাতের প্রয়োজন ছাড়াই গুরু-পরম্পরার সঙ্গে একজন সাধকের প্রত্যক্ষ ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছেন।
এই পাঠমালার মাধ্যমে গুরুদেব পরমহংস যোগানন্দজি আত্মমুক্তিদায়ী ক্রিয়াযোগ-প্রক্রিয়া বিশ্বের প্রত্যেক আন্তরিক আধ্যাত্মিক অন্বেষীর জন্য সর্বজনীনভাবে উপলব্ধ করে তুলেছেন।
ওয়াইএসএস/এসআরএফ পাঠমালা একটি প্রকৃত আধ্যাত্মিক প্রবেশদ্বার। এর মাধ্যমে ক্রিয়াযোগের সেই পবিত্র শিক্ষা উপস্থাপিত হয়েছে, যা গুরু-পরম্পরার ধারায় মহাবতার বাবাজি, লাহিড়ী মহাশয়, স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বরজি এবং পরমহংস যোগানন্দজির মাধ্যমে সংরক্ষিত ও সঞ্চারিত হয়েছে। এটি কোনো সাংগঠনিক দাবির ভিত্তিতে নয়; বরং এই সেই নির্দিষ্ট ধারা, যার মাধ্যমে বাবাজি নির্দেশ দিয়েছিলেন যে এই শিক্ষা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
“বিশেষ ঈশ্বরীয় বিধানের মাধ্যমে, শ্রীকৃষ্ণ, খ্রিস্ট, মহাবতার বাবাজি, লাহিড়ী মহাশয় এবং স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বরজি দ্বারা আমাকে নির্বাচিত করা হয়েছে, যাতে যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার শিক্ষার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের মূল যোগ এবং খ্রিস্টের মূল খ্রিস্টধর্মের ঐক্যবদ্ধ সত্যের ভিত্তিতে ক্রিয়াযোগ-বিজ্ঞানকে সারা বিশ্বে প্রচার করতে পারি।”
— পরমহংস যোগানন্দ
বাবাজি দূরদৃষ্টির দ্বারা উপলব্ধি করেছিলেন যে এমন এক সময় আসবে, যখন এই বিশ্বকে বিভাজন, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ পরিত্যাগ করতেই হবে। এই উন্নততর যুগের বিকাশ পর্বে ধর্ম নিরপেক্ষতা ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্রমোন্নতির সঙ্গে মানবজাতিকে একসঙ্গে বাস করতে শিখতে হবে, নচেৎ তারা নিজেদেরই ধ্বংস ডেকে আনবে। ক্রিয়াযোগকে পাশ্চাত্যে প্রেরণের মাধ্যমে সেই চিরন্তন সত্যের সারমর্ম, যা যুগ যুগ ধরে এই আধ্যাত্মিক মাতৃভূমি ভারতবর্ষে লালিত ও সংরক্ষিত হয়েছে — একদিন মহান আলোকরশ্মির মতো সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে এবং ধীরে ধীরে শান্তি, পারস্পরিক বোঝাপড়া, ঐক্য, সম্প্রীতি ও বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে।
ওয়াইএসএস/এসআরএফ ভারতবর্ষ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসংখ্য আশ্রম, ধ্যানকেন্দ্র ও নিভৃতাবাস প্রতিষ্ঠা করেছে। এই আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলি শান্তির আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে, প্রাচীন বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াযোগ-পদ্ধতির প্রচার করে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে আত্মোপলব্ধির পথে আজও দিশা দিয়ে চলেছে।
বর্তমানে ওয়াইএসএস এবং এসআরএফ যৌথভাবে বিশ্বের ১৭৫টিরও বেশি দেশে ভক্তদের সেবা প্রদান করছে। পরমহংস যোগানন্দজির যোগী-কথামৃত যার মাধ্যমে বিশ্ব প্রথম মহাবতার বাবাজির পরিচয় লাভ করে — ৫০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। অগণিত ক্রিয়াযোগী প্রতিদিন তাঁদের নিজ নিজ গৃহে অথবা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত ওয়াইএসএস/এসআরএফ-এর ধ্যানকেন্দ্র ও আশ্রমে এই পবিত্র প্রক্রিয়ার অনুশীলন করেন।
“এই কর্মকান্ড ঈশ্বরের দ্বারা ভারতবর্ষে, আমেরিকায় এবং সমগ্র বিশ্বে বাবাজি, লাহিড়ী মহাশয় এবং আমার গুরুদেব শ্রীযুক্তেশ্বরজির মাধ্যমে প্রেরিত হয়েছে । তোমরা দেখবে, প্রথমে এটি এক মৃদুমন্দ সমীরণের মতো শুরু হবে। ধীরে ধীরে তা আরও প্রবল বায়ুপ্রবাহে পরিণত হবে। একসময় এটি এক মহাশক্তিধর ঝড়ো বাতাসে রূপ নেবে, যে শক্তি মায়াময় এই বিশ্বের সমস্ত অশুদ্ধতাকে দূর করে অসীম কল্যাণ সাধন করবে।”
— পরমহংস যোগানন্দ
মহাবতার বাবাজির গুহা
১৮৬১-তে মহাবতার বাবাজির দ্বারা ক্রিয়াযোগের পুনরুজ্জীবন আধুনিক যুগের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই স্বর্গীয় ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল হিমালয়ের কুমায়ুন অঞ্চলে, মনোরম দুনাগিরি পর্বতমালার কোলে অবস্থিত এক ছোট্ট গুহায়। এই পবিত্র গুহাতেই মহাবতার বাবাজি তাঁর মহান শিষ্য লাহিড়ী মহাশয়কে প্রাচীন ক্রিয়াযোগ-বিজ্ঞানে দীক্ষিত করেছিলেন। সমস্ত ক্রিয়াযোগী তাঁদের গুরু-পরম্পরার সূত্রপাত এই ঐতিহাসিক ঘটনাতেই খুঁজে পান।
আজও মহাবতার বাবাজি এবং লাহিড়ী মহাশয়ের আশীর্বাদ এই পবিত্র গুহা ও তার পার্শ্ববর্তী সমগ্র অঞ্চলকে আধ্যাত্মিকভাবে পরিপূর্ণ করে রেখেছে।
লাহিড়ী মহাশয়ের এই গুহায় তাঁর দিব্যগুরুর সঙ্গে প্রথম অলৌকিক সাক্ষাৎ, পূর্বজন্মের স্মৃতির পুনর্জাগরণ এবং এই গুহার ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য সম্পর্কে জানতে পাঠকদের যোগী-কথামৃত-র ৩৪তম অধ্যায় “হিমালয়ে প্রাসাদ সৃষ্টি” পাঠ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আপনি যদি হিমালয়ে মহাবতার বাবাজির গুহা দর্শনের পরিকল্পনা করতে চান, তাহলে অনুগ্রহ করে দ্বারাহাটের যোগদা সৎসঙ্গ শাখা আশ্রম-এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
মহাবতার বাবাজির এক আশীর্বাদ
১৯৬৩–৬৪-তে মহাবতার বাবাজির গুহা পরিদর্শনের সময়, শ্রী দয়ামাতা (১৯৫৫ থেকে ২০১০-এ মহাসমাধি পর্যন্ত ওয়াইএসএস/এসআরএফ-এর তৃতীয় অধ্যক্ষ ও সংঘমাতা) মহান গুরুর এক দিব্য অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। তাঁর গ্রন্থ Only Love-এ তিনি সেই অভিজ্ঞতার সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। নীচে তার একটি অংশ উদ্ধৃত করা হল:
“…হঠাৎ সমগ্র কক্ষটি এক সোনালি জ্যোতিতে আলোকিত হয়ে উঠল। সেই আলো ধীরে ধীরে এক উজ্জ্বল নীল বর্ণ ধারণ করল এবং আবারও আমাদের প্রিয় বাবাজির দিব্য উপস্থিতি অনুভূত হল! এবার তিনি বললেন, ‘হে বৎস, এটি জেনে রাখো: আমাকে খুঁজে পেতে ভক্তদের এই স্থানে আসার প্রয়োজন নেই। যে কেউ গভীর ভক্তিভরে অন্তরে প্রবেশ করে আমাকে ডাকে এবং আমার প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে অবশ্যই আমার সাড়া লাভ করবে।’…
“তারপর আমি বললাম, ‘বাবাজি, আমার প্রভু, আমাদের গুরুদেব আমাদের শিখিয়েছেন যে, যখনই আমরা প্রজ্ঞার স্পর্শ অনুভব করতে চাই, তখন শ্রীযুক্তেশ্বরজির কাছে প্রার্থনা করতে হবে, কারণ তিনি জ্ঞানময়; আর যখনই আমরা আনন্দ বা পরমানন্দ অনুভব করতে চাই, তখন লাহিড়ী মহাশয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মিলিত হতে হবে। আপনার স্বরূপ কী?’ “এই প্রশ্নটি করার সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, যেন আমার হৃদয় প্রেমে বিস্ফোরিত হয়ে যাবে—এমন প্রেম, যেন সহস্র কোটি প্রেম একত্রিত হয়ে এক প্রেমে রূপ নিয়েছে! তিনি সম্পূর্ণ প্রেমময়; তাঁর সমগ্র স্বরূপই প্রেম (দিব্যপ্রেম)।
“তিনি মুখে কিছু না বললেও, এর চেয়ে অধিক উপযোগী উত্তর কল্পনা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু বাবাজি সেই অভিজ্ঞতাকে আরও মধুর ও অর্থবহ করে তুললেন এই কথাগুলি যোগ করে: ‘আমার স্বরূপ প্রেম; কারণ একমাত্র প্রেমই এই বিশ্বকে পরিবর্তন করতে পারে।’”
মহাবতার বাবাজিকে নিয়ে কয়েকটি কাহিনি (যোগী-কথামৃত থেকে)
পরমহংস যোগানন্দ, যোগী-কথামৃত-র ৩৩তম অধ্যায়ে মহাবতার বাবাজির জীবন থেকে কয়েকটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে তিনটি এখানে উপস্থাপিত হল। প্রথম দুটি কাহিনি বর্ণনা করেছিলেন স্বামী কেবলানন্দজি পরমহংস যোগানন্দজির সংস্কৃত শিক্ষক যিনি হিমালয়ে কিছু সময় মহাবতার বাবাজির সান্নিধ্যে ছিলেন। তৃতীয় ঘটনাটি যোগানন্দজিকে বলেছিলেন শ্রী রামগোপাল মজুমদার, যাঁকে যোগী-কথামৃত-তে “বিনিদ্র সাধু” নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেবলানন্দজি পরমহংসজিকে বলেছিলেন:
“বাবাজির জীবনের দুটি বিস্ময়কর ঘটনার কথা আমি জানি,” কেবলানন্দজি বলতে লাগলেন। “এক রাতে তাঁর শিষ্যরা একটি বৃহৎ অগ্নিকুণ্ডকে ঘিরে বসেছিলেন, যেখানে এক পবিত্র বৈদিক যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। হঠাৎ গুরুদেব জ্বলন্ত কাঠের একটি গুঁড়ি তুলে নিয়ে আগুনের কাছে বসে থাকা এক চেলার অনাবৃত কাঁধে হালকাভাবে আঘাত করলেন।
“‘গুরুদেব, একি নিষ্ঠুরতা !’ উপস্থিত লাহিড়ী মহাশয় প্রতিবাদ করে বললেন।
“‘তুমি কি বরং দেখতে চাইতে যে, অতীত কর্মফলের বিধান অনুসারে তোমার চোখের সামনেই সে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যাক?’
“এই কথা বলে বাবাজি তাঁর আরোগ্যদায়ী হাতটি সেই চেলার দগ্ধ কাঁধে স্পর্শ করলেন। ‘আজ রাত্রে আমি তোমাকে এক যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু থেকে মুক্ত করলাম। অগ্নির এই সামান্য কষ্টের মাধ্যমেই তোমার কর্মের বিধান পূর্ণ হয়েছে।’”
“আরেকবার, এক অপরিচিত ব্যক্তির আগমনে বাবাজির পবিত্র সাধুসভা ব্যাহত হল। অসাধারণ দক্ষতায় তিনি গুরুদেবের শিবিরের নিকটবর্তী প্রায় দুর্গম পাহাড়ি প্রস্তরমঞ্চে আরোহণ করেছিলেন।
“‘প্রভু, আপনিই নিশ্চয় সেই মহান বাবাজি।’ লোকটির মুখে অবর্ণনীয় শ্রদ্ধার দীপ্তি ফুটে উঠেছিল। ‘মাসের পর মাস ধরে আমি এই দুর্গম পর্বতমালার মধ্যে আপনার সন্ধানে নিরন্তর ঘুরে বেড়িয়েছি। আমি আপনাকে বিনীতভাবে অনুরোধ করছি আমাকে আপনার শিষ্যরূপে গ্রহণ করুন।’
“মহান গুরু যখন কোনো উত্তর দিলেন না, তখন লোকটি তাঁর পায়ের নীচের গভীর খাদটির দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘আপনি যদি আমাকে গ্রহণ না করেন, তবে আমি এই পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণত্যাগ করব। আপনার মাধ্যমে ঈশ্বরলাভের পথ না পেলে আমার জীবনের আর কোনো মূল্য নেই।’
“‘তাহলে ঝাঁপ দাও,’ বাবাজি সম্পূর্ণ নির্বিকারভাবে বললেন। ‘তোমার বর্তমান আধ্যাত্মিক অবস্থায় আমি তোমাকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করতে পারি না।’
“লোকটি এক মুহূর্ত দেরি না করে পাহাড়ের খাড়া ঢাল থেকে ঝাঁপ দিল। বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া শিষ্যদের বাবাজি নির্দেশ দিলেন, যেন তারা গিয়ে অপরিচিত ব্যক্তির দেহটি নিয়ে আসে। যখন তারা তাঁর বিকৃত ও ক্ষতবিক্ষত দেহ ফিরিয়ে আনল, তখন গুরুদেব তাঁর দিব্যহস্ত মৃতদেহের উপর স্থাপন করলেন। আশ্চর্য! লোকটি সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলল এবং সর্বশক্তিমান গুরুর চরণে বিনম্রভাবে প্রণাম করল।
“‘এখন তুমি শিষ্যত্ব গ্রহণের যোগ্য হয়েছ।’ পুনর্জীবিত সেই চেলার দিকে প্রেমময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাবাজি বললেন। ‘তুমি সাহসের সঙ্গে এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ। মৃত্যু আর কখনও তোমাকে স্পর্শ করবে না; আজ থেকে তুমি আমাদের অমর সম্প্রদায়ের একজন সদস্য।’ এরপর তিনি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বিদায়বাক্য উচ্চারণ করলেন, ‘ডেরা ডাণ্ডা উঠাও’; আর সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র দলটি পর্বত থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।”
রণবাজপুরে “বিনিদ্র সাধু” রাম গোপালের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের সময়, তিনি মহাবতার বাবাজির সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের এক বিস্ময়কর কাহিনি আমাকে বলেছিলেন।
“আমি মাঝে মাঝে আমার নির্জন গুহা থেকে বেরিয়ে কাশীতে লাহিড়ী মহাশয়ের চরণে বসতে যেতাম,” রামগোপাল আমাকে বললেন। “একদিন মধ্যরাতে, তাঁর কয়েকজন শিষ্যের সঙ্গে নীরবে ধ্যানরত অবস্থায় গুরুদেব আমাকে এক বিস্ময়কর নির্দেশ দিলেন।
“‘রামগোপাল,’ তিনি বললেন, ‘এখনই দশাশ্বমেধ স্নানঘাটে যাও।’
“আমি দ্রুত সেই নির্জন স্থানে পৌঁছে গেলাম। চারদিকে উজ্জ্বল চাঁদের আলো আর ঝিকিমিকি করা নক্ষত্রে রাতটি অপরূপ হয়ে উঠেছিল। কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরে নীরবে বসে থাকার পর আমার দৃষ্টি পায়ের কাছে থাকা এক বিশাল প্রস্তরখণ্ডের দিকে আকৃষ্ট হল। ধীরে ধীরে সেটি উপরে উঠতে লাগল এবং তার নীচে একটি ভূগর্ভস্থ গুহার প্রবেশপথ প্রকাশ পেল। পাথরটি কীভাবে যেন শূন্যে স্থির হয়ে রইল। সেই গুহা থেকে আবৃতবস্ত্রা এক অপরূপ সুন্দরী যুবতীর দেহ ধীরে ধীরে আকাশে ভেসে উঠল। কোমল এক আলোকমণ্ডলে পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি আমার সামনে নেমে এলেন এবং গভীর ভাবসমাধিতে নিমগ্ন অবস্থায় নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি সঞ্চলিত হয়ে কোমল কণ্ঠে বললেন।
“‘আমি মাতাজি, বাবাজির ভগিনী। আজ রাতে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য আমি বাবাজি এবং লাহিড়ী মহাশয় উভয়কেই আমার এই গুহায় আসতে অনুরোধ করেছি।’
“ঠিক তখনই গঙ্গার উপর দিয়ে এক কুয়াশার মতো জ্যোতির্ময় আলো দ্রুত ভেসে আসতে লাগল। তার অদ্ভুত আলোকচ্ছটা গঙ্গার গাঢ় জলে প্রতিফলিত হচ্ছিল। আলোটি ক্রমশ নিকটে এসে এক অন্ধকার-ভেদী ঝলকের সঙ্গে মাতাজির পাশে উপস্থিত হল এবং মুহূর্তের মধ্যে লাহিড়ী মহাশয়ের মানবদেহে রূপান্তরিত হল। তিনি বিনম্রভাবে সেই মহীয়সী সাধিকার চরণে প্রণাম করলেন।
“আমি তখনও বিস্ময় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারিনি, এমন সময় আকাশে ঘূর্ণায়মান এক রহস্যময় জ্যোতিপুঞ্জ দেখে আরও বিস্মিত হলাম। দ্রুত নেমে এসে সেই অগ্নিদীপ্ত আলোকচক্রটি আমাদের কাছে পৌঁছোল এবং এক অপরূপ সুন্দর যুবকের দেহে রূপ নিল। সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝতে পারলাম, ইনিই বাবাজি। তাঁর চেহারা অনেকটাই লাহিড়ী মহাশয়ের মতো ছিল, পার্থক্য শুধু এই যে, বাবাজিকে অনেক বেশি তরুণ দেখাচ্ছিল এবং তাঁর দীর্ঘ, উজ্জ্বল কেশরাশি ছিল।
“লাহিড়ী মহাশয়, মাতাজি এবং আমি আমরা তিনজনই গুরুর চরণে নতজানু হলাম। তাঁর দিব্যদেহ স্পর্শ করতেই আমার অস্তিত্বের প্রতিটি কণায় স্বর্গীয় আনন্দের এক অতীন্দ্রিয় স্পন্দন বয়ে গেল।
“‘প্রিয় ভগিনী,’ বাবাজি বললেন, ‘আমি আমার এই দেহ ত্যাগ করে অসীম চৈতন্যধারায় বিলীন হওয়ার সংকল্প করেছি।’
“‘প্রিয় গুরুদেব, আপনার এই সংকল্প আমি আগেই অনুভব করেছি। সেই কারণেই আজ রাতে এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিলাম। আপনি কেন এই দেহ পরিত্যাগ করবেন?’ মহীয়সী সেই সাধিকা তাঁর দিকে গভীর অনুনয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন।
“‘আমি আমার আত্মার মহাসমুদ্রে দৃশ্যমান অথবা অদৃশ্য যে কোনো তরঙ্গ ধারণ করি, তাতে কী-ই বা পার্থক্য?’
“মাতাজি মৃদু হাস্যরসে উত্তর দিলেন, ‘হে অমর গুরু, যদি তাতে সত্যিই কোনো পার্থক্য না থাকে, তবে অনুগ্রহ করে আপনার এই দেহ কখনও পরিত্যাগ করবেন না।’
“‘তাই হোক,’ বাবাজি গম্ভীরভাবে বললেন। ‘আমি কখনও আমার স্থূলদেহ ত্যাগ করব না। এই পৃথিবীতে অন্তত কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে আমার এই দেহ সর্বদা দৃশ্যমান থাকবে। তোমার ওষ্ঠাধর দিয়ে স্বয়ং ঈশ্বর তাঁর ইচ্ছাই প্রকাশ করেছেন।’
“এই মহামহিম আত্মাদের কথোপকথন আমি অভিভূত বিস্ময়ে শুনছিলাম। এমন সময় মহান গুরু সস্নেহে আমার দিকে ফিরে তাকালেন।
“‘ভয় কোরো না, রামগোপাল। তুমি ধন্য, কারণ এই অমর প্রতিশ্রুতির সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য তোমার হয়েছে।’
“বাবাজির সুমধুর কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। তাঁর এবং লাহিড়ী মহাশয়ের দেহ ধীরে ধীরে শূন্যে ভেসে উঠে গঙ্গার উপর দিয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল। এক দীপ্তিময় আলোকবৃত্ত তাঁদের দেহকে পরিবেষ্টিত করেছিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁরা রাত্রির আকাশে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। মাতাজির দেহ পুনরায় ভেসে গুহার মধ্যে প্রবেশ করল; তারপর সেই বিশাল প্রস্তরখণ্ডটি যেন অদৃশ্য কোনো শক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়ে আবার নেমে এসে গুহার প্রবেশপথ বন্ধ করে দিল।
“অসীম প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি পুনরায় লাহিড়ী মহাশয়ের আশ্রমের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।”
মহাবতার বাবাজি স্মৃতি দিবস
প্রতি বছর ২৫ জুলাই মহাবতার বাবাজি স্মৃতি দিবস পালিত হয়। এই পবিত্র দিবসটি মহাবতার বাবাজি ও পরমহংস যোগানন্দজির সেই ঐশ্বরিক সাক্ষাতের স্মরণে উদযাপিত হয়, যখন বাবাজি পরমহংসজিকে সমগ্র বিশ্বে ক্রিয়াযোগের শিক্ষা প্রচারের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন।
এই পবিত্র দিবস উপলক্ষ্যে ওয়াইএসএস-এর আশ্রম ও কেন্দ্রগুলিতে একটি বিশেষ স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যার মধ্যে ধ্যান, অনুপ্রেরণামূলক পাঠ এবং ভক্তিগীতি অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া, ওয়াইএসএস-এর কোনো একটি আশ্রম থেকে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, যাতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভক্তরাও অনলাইনে অংশগ্রহণ করতে পারেন।
















