গুরুদেবের কার্যপরিচালনায় সেবা ও সাধনার এই যুগল সম্বন্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে গিয়ে আমাদের শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ এবং আধ্যাত্মিক প্রধান শ্রীশ্রী স্বামী চিদানন্দ গিরি বলেছেন, “সাধনা ব্যতীত সেবা স্থায়ী ফলপ্রসূ হয় না। আর সেবা—নিঃস্বার্থপরতা, আত্মোৎসর্গ ব্যতীত সাধনার লক্ষ্য সাধারণত অধরাই থেকে যায়।”
উপরোক্ত নির্দেশনাকে জীবনে প্রয়োগ করার উদ্দেশ্যে, ভারত ও নেপালের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ষাটজনেরও অধিক ওয়াইএসএস যুব-সেবক-দলের স্বেচ্ছাসেবক ২০২৬-এর ১৯ থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ওয়াইএসএস দক্ষিণেশ্বর আশ্রমে একত্রিত হয়েছিলেন। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল সাধনা, আধ্যাত্মিক অধ্যয়ন এবং সম্মিলিতভাবে শিক্ষালাভ। পাঁচ দিনব্যাপী এই প্রথম নিভৃতাবাসে যুব-সেবক পরিচালকদের দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে কিছুটা সরে এসে, সকলে মিলে গভীরভাবে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হওয়ার এক অনন্য সুযোগ এনে দিয়েছিল।
দক্ষিণেশ্বর আশ্রমে যুব-স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে ওয়াইএসএস-এর সন্ন্যাসীগণের
কীর্তনসহ দীর্ঘক্ষণ ধ্যানের অধিবেশন এই নিভৃতাবাসের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। প্রতিদিনের শ্রবণ (সমবেত অধ্যয়ন) অধিবেশনগুলিতে সমাজ গঠন ও নেতৃত্বদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এগুলি অংশগ্রহণকারীদের পুনরুদ্যম এবং আত্মিক বন্ধন দৃঢ় করার এক অত্যন্ত প্রশংসিত সুযোগও প্রদান করেছিল। পরিকল্পনামূলক পর্যালোচনা বৈঠক ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নির্ধারণের অধিবেশনের মাধ্যমে এই নিভৃতাবাস যুব স্বেচ্ছাসেবকদের কার্যক্রম সম্পর্কে আরও বিস্তৃত ধারণা লাভে সাহায্য করে। এর ফলে তাঁরা বিভাগের বর্তমান প্রয়োজনগুলি উপলব্ধি করতে পারেন এবং বিভিন্ন উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের জন্য কীভাবে অংশগ্রহণ করা যায়, সে সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা লাভ করেন।
“এই নিভৃতাবাস ছিল আত্মচিন্তায় নিমগ্ন হওয়ার জন্য, আধ্যাত্মিকতায় নবশক্তি লাভ করার জন্য, আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য এবং সেবার আদর্শে নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার জন্য এক সুন্দর ও অর্থবহ যাত্রা।”
সেবার আধ্যাত্মিক ভিত্তিকে গভীরতর করা
এই নিভৃতাবাসটি শিষ্য স্বেচ্ছাসেবকগণকে তাঁদের আধ্যাত্মিক পথচলা নিয়ে আত্মবিশ্লেষণ করতে এবং সেবা দানে তাঁদের গভীরতর সংকল্প ও উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করতে সহায়তা করেছে। “কেবল ঈশ্বর”—এই আদর্শের দিকে সকলের মনোযোগকে পুনরায় ফিরিয়ে এনে এই কর্মসূচি পারস্পরিক সৌহার্দ্যের সাথে সাথে, অভিজ্ঞতা বিনিময়, শিক্ষালাভ ও ভাবের আদান-প্রদানের সঙ্গে ওয়াইএসএস-এর আধ্যাত্মিক সাধনপথের মূল লক্ষ্যকে সুন্দরভাবে সমন্বিত করেছিল।
গঙ্গার তীরে অবস্থিত দক্ষিণেশ্বর আশ্রমের শান্ত ও পবিত্র পরিবেশ এই অন্তর্মুখী সাধনাকে আরও গভীর করে তুলেছিল। ভোরবেলায় দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির দর্শন এবং নৈশভোজের পর গল্প বলা, কবিতা পাঠ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সময় কাটানো—এসব ছিল এই নিভৃতাবাসের কিছু অভিনব ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরে মা ভবতারিণীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করা
“এত সুচিন্তিত এই নিভৃতাবাসের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই এবং বিশেষ করে কালীমায়ের মন্দিরদর্শন। দিব্য জননীর ভালোবাসা যেন বাস্তবভাবেই আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে, এ আমি অনুভব করেছি।”
একটি সম্মিলিত উদ্দেশ্যের অনুভূতি
বর্তমানে, সারা ভারতে প্রায় ৪০০ জন যুব-সেবা স্বেচ্ছাসেবকেরা বিভিন্ন উদ্যোগে নানা দায়িত্ব পালন করছেন। এই উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে:
- যুব সাধক সঙ্গম
- অনলাইন যুব সাধক সম্প্রদায়ের সৎসঙ্গ
- শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের গ্রীষ্মকালীন শিবির
- অনলাইন কিশোর-কিশোরীদের সৎসঙ্গ
- ওয়াইএসএস কেন্দ্র ও মণ্ডলীতে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ব্যক্তিগত উপস্থিতিতে সৎসঙ্গের আয়োজন ইত্যাদি
এই নিভৃতাবাসে বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা একত্রিত হয়েছিলেন—যাঁদের মধ্যে ছিলেন সহায়ক, প্রশিক্ষক, বিষয়বস্তু নির্মাতা, কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যবস্থাপক। এ ছাড়াও, তরুণ সাধক ফেলোশিপ-এর মূল দলের প্রায় ২০ জন তরুণ সাধক এই নিভৃতাবাসে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁদের নতুন নতুন ভাবনা ও প্রস্তাব উপস্থাপিত করেন।
পারস্পরিক সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আয়োজিত এই আন্তঃপ্রজন্মের মিলনমেলা বিভিন্ন বয়সের ভক্তদের একে অপরের থেকে শেখার, নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করার এবং নতুন উপলব্ধি অর্জনের সুযোগ করে দেয়। এর ফলে, যুব পরিষেবার কাজে সেবা করার প্রকৃত তাৎপর্য এবং আরও বৃহত্তর অর্থে, যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি-র একজন স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালনের মর্ম উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও প্রসারিত হয়। সমগ্র নিভৃতাবাসে আত্মসমীক্ষা, পারস্পরিক আলোচনা এবং সম্মিলিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
২০২৭-এর জন্য পরিকল্পিত সেবার আটটি ক্ষেত্র নিভৃতাবাসে উপস্থিত সকলের সামনে তুলে ধরা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, তাঁরা যেন নিজেদের আগ্রহ ও পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পছন্দসই সেবার ক্ষেত্রগুলি বেছে নিতে পারেন এবং ভবিষ্যতে অন্য কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁরা অংশগ্রহণ করতে পারবেন, তা-ও বিবেচনা করে দেখতে পারেন।
নিভৃতাবাস থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ও উপলব্ধি
- ধ্যান ও নিভৃতাবাসের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে স্বেচ্ছাসেবকেরা আধ্যাত্মিকতায় নবোদ্যম ও সজীবতা লাভ করেন।
- একসঙ্গে সেবাকার্য সম্পাদন এবং নতুন বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরও দৃঢ় হয়।
- যুব পরিষেবার বিভিন্ন সেবাক্ষেত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে, এই পরিষেবার বৃহত্তর লক্ষ্য ও আদর্শ সম্পর্কে তাঁরা আরও গভীর ও বিস্তৃত ধারণা লাভ করেন।
- স্বেচ্ছাসেবকেরা সেবার আদর্শ ও মূলনীতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা লাভ করেন।
- কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক গুরুদেবের কাজে আরও বেশি দায়িত্ব গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত হন।
“সেবাই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত”
এই নিভৃতাবাসে পরমহংস যোগানন্দজির একটি বাণীর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তিনি বলেছিলেন:
জীবনের প্রধান আদর্শ হওয়া উচিত সেবা। এই আদর্শ না থাকলে, তোমার ঈশ্বর-প্রদত্ত বুদ্ধিমত্তা তার প্রকৃত লক্ষ্যের দিকে এগোবে না। সেবার কাজে যখন তুমি নিজের ক্ষুদ্র ‘আমি’-কে ভুলে যাবে, তখন তোমার মধ্যে পরমাত্মার সেই বৃহৎ সত্তার অনুভূতি জাগ্রত হবে… যখন তুমি উপলব্ধি করবে যে জীবন একদিকে কর্তব্য পালনের এক আনন্দময় সংগ্রাম, আবার তারই সাথে ক্ষণস্থায়ী এক স্বপ্ন; আর যখন অন্যকে দয়া ও শান্তি দান করে সুখী করে তোলার আনন্দে তোমার হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে, ঈশ্বরের দৃষ্টিতে তখন তোমার জীবন হবে সত্যিই সার্থক।























