শ্রী দয়ামাতার বক্তৃতার এক নতুন সংকলন জার্ণি উইথ পরমহংস যোগানন্দ গ্রন্থের একটি অধ্যায়—“স্পিরিচুয়াল ম্যাচ্যু্রিটি মীন্স অ্যাট্যুনমেন্ট উইথ গড” থেকে একটি সংক্ষিপ্ত অংশ নীচে তুলে ধরা হল। গ্রন্থটি শীঘ্রই সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপ থেকে এবং পরবর্তীকালে যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া থেকে প্রকাশিত হবে। এই উদ্ধৃতাংশে যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া ও সেল্ফ-রিয়লাইজেশন ফেলোশিপের তৃতীয় অধ্যক্ষ এবং সঙ্ঘমাতা, ও সকলের প্রিয় শ্রী দয়ামাতা, পরমহংস যোগানন্দের কয়েকটি মুক্তিদায়ক সত্য তুলে ধরেছেন; সেইসঙ্গে, জীবনে যে সত্যকে আমরা বাস্তবায়িত করতে চাই, সেগুলিকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার গুরুত্বও ব্যাখ্যা করেছেন।
পরমহংস যোগানন্দ যখন আমাদের ধ্যানের জন্য একত্রিত হতে বলতেন, তখন কখনও কখনও তিনি খুব অল্প কথাই বলতেন। কিন্তু তাঁর সেই অল্প কয়েকটি কথার মধ্যেই নিহিত থাকত গভীর অর্থ ও সত্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার। আমার মনে হত, তাঁর প্রতিটি কথাই—তা শৃঙ্খলা পালনের নির্দেশই হোক বা প্রশংসাই হোক —তিনি যেন আমাকেই উদ্দেশ্য করে বলছেন। তাঁর প্রতিটি কথাকে আমি নিজের জীবনে প্রয়োগ করার নির্দেশ ভেবে গ্রহণ করতাম। অন্য কেউ সেই নির্দেশ অনুসরণ করল কি না, তা নিয়ে আমি কখনও চিন্তা করতাম না। তাঁর কথাগুলি, বিশেষ করে, তিনি যখন তিরস্কার করতেন, তখন আমি কখনও মনে করতাম না যে তাঁর কথাগুলি অন্য কাউকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। আমি সত্যের প্রতিটি ক্ষুদ্র কণাকে সযত্নে কুড়িয়ে নিতাম এবং অমূল্য সম্পদের মত হৃদয়ে আগলে রাখতাম। আমার মনে হত, তিনি যা বলছেন, তা যদি আমি অন্তরে গ্রহণ না করি, তবে তাঁর সেই কথাগুলি বলার কোনো সার্থকতাই নেই। আজ আমাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে সেকথা একই ভাবে প্রযোজ্য। ঈশ্বরকে যদি আমরা জানতে চাই, তবে গুরুর নির্দেশ অনুসরণ করার জন্য আমাদেরও এই ধরনের আন্তরিক প্রচেষ্টা করতে হবে।
একদিন সন্ধ্যায় ধ্যানের পর গুরুদেব যখন আমাদের আশীর্বাদ করছিলেন, তখন তিনি তিনটি কথা বলেছিলেন, যা সেই থেকে আমি আমার জীবনে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করে এসেছি। আমি আপনাদের সকলকে অনুপ্রাণিত করছি, আজ থেকেই এগুলো অনুশীলন করতে থাকুন:
- সহানুভূতিশীল হও।
- অন্যের সমালোচনা কোরো না।
- নম্র হও।
নিজের ঘরে ফিরে আমি কথাগুলি লিখে রাখলাম এবং এমন একটি জায়গায় রাখলাম, যেখান থেকে তা যেন আমাকে সর্বদা কথাগুলি মনে করিয়ে দিতে পারে।
সহানুভূতিশীল হও: এর অর্থ আরও সহানুভূতিশীল ও সহমর্মী হওয়া; অন্যদের প্রতি সহানুভূতি বোধ করা, তাদের প্রতি সদয় ও বিবেচনাশীল থাকা, প্রয়োজনে তাদের সহায়তা করা এবং সর্বদা অন্যের মঙ্গল চিন্তা করা।
সমালোচনা কোরো না: অন্যের সমালোচনা করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়া একসময় মনের এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধিতে পরিণত হতে পারে। এই বদভ্যাসে জড়িয়ে পড়া খুব সহজ, কারণ এই পৃথিবীতে কিছুই সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়। প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু না কিছু ত্রুটি রয়েছে, যা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান —আর অবশ্যই, আমরাও তার ব্যতিক্রম নই। তবে নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে অন্যের দোষত্রুটির অতিরিক্ত সমালোচনা করা আর শুধুমাত্র সেই ভুলগুলি এড়িয়ে চলার জন্য শিক্ষা হিসেবে নীরবে অন্যের ভুলগুলি লক্ষ্য করা—এই দুটির মধ্যে সূক্ষ্ম অথচ গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। পরস্পরকে বিচার করে অভিমত ব্যক্ত করার অধিকার আমাদের নেই; সেই অধিকার একমাত্র ঈশ্বরের। অন্যের সমালোচনা করাই যার স্বভাব, আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে তার এই স্বভাব এক বড় ত্রুটি হয়ে দাঁড়াবে।
নম্র হও: “আমি নম্র”—এই মিথ্যা কথার মধ্যে নম্রতা প্রকাশ পায় না; নম্রতা প্রকাশ পায় আমাদের মনোভাবে। নম্রতা হল ঈশ্বরের সঙ্গে এক মধুর, অন্তরঙ্গ, নীরব ও প্রেমময় সম্পর্ক, যেখানে কোনো কৃতিত্ব আমাদের প্রাপ্য বলে আমরা কখনও মনে করি না। কেউ যখন আমাদের প্রশংসা করেন, তখন আমরা উপলব্ধি করি যে ঈশ্বরের আশীর্বাদ, নির্দেশনা ও সাহায্য ছাড়া আমরা কখনও সেই স্বীকৃতি লাভ করতে পারতাম না।
প্রকৃত নম্রতা লাভের জন্য প্রার্থনা করুন—আত্মবিস্মরণকারী এমন এক মনোভাব, যেখানে অনুভব করা যায়: “প্রভু, তুমিই কর্তা, আমি নই।” এই কথাটিকে মনের মধ্যে মন্ত্রের মতো বারবার জপ করুন, গভীর মনোযোগ সহকারে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন, যেন তিনি আপনাকে অহংকার থেকে মুক্ত করেন। নম্রতা ছাড়া আধ্যাত্মিক জীবন গড়ে তোলার কোনো দৃঢ় ভিত্তি থাকে না। মন ও হৃদয় যত বেশি ঈশ্বরের চিন্তা এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসায় পূর্ণ হবে, আত্মসর্বস্ব, কেবল ‘আমি, আমি, আমি’— এই বোধের জন্য ততই কম জায়গা অবশিষ্ট থাকবে।
গুরুদেব আমাদের যে মুক্তিদায়ক সত্যকে উপস্থাপন করেছেন, সেগুলি যথাসম্ভব সুস্পষ্ট এবং প্রাণবন্তভাবে আপনাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমার পরম সৌভাগ্যের ও আনন্দের বিষয়। এগুলি তাঁরই উপদেশ। ঈশ্বর অন্বেষণে আপনাদের আন্তরিক প্রচেষ্টাতে এই সত্যকে জীবনে প্রয়োগ করুন। আধ্যাত্মিক বিকাশ সর্বপ্রথম নিজের অন্তরের বিষয়। এই সত্যকে যদি নিজের হৃদয়ে স্থান দেন, গভীরভাবে তা নিয়ে চিন্তা করেন এবং নিজেদের চিন্তাভাবনা ও প্রার্থনাকে এই সত্যের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত করেন, তবে ধীরে ধীরে সেগুলি আপনাদের জীবনে বাহ্যিকভাবেও প্রকাশ পেতে শুরু করবে। “কারণ, মানুষ অন্তরে যেমন চিন্তা করে, সে তেমনই হয়ে ওঠে।” *
পাদটীকা:
* প্রবাদবাক্য ২৩:৭ (বাইবেল)।



















