“‘কী করে মশার হাত এড়ানো যায়’ — যোগবলে অন্তরে শান্তি” — পরমহংস যোগানন্দ

৬ মার্চ, ২০২৬

নীচের অংশটি পরমহংস যোগানন্দজির বহু প্রশংসিত জীবন কাহিনী অটোবায়োগ্রাফি অফ এ য়োগি র বাংলা অনুবাদ যোগী-কথামৃত-র অন্তর্গত “আমার গুরুর আশ্রমে বহু বৎসর” অধ্যায়টি থেকে উদ্ধৃত, যেখানে তিনি তাঁর মহান গুরু, স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বরজির সঙ্গে অনেক গভীর অনুপ্রেরণামূলক অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছেন। নীচে স্বামী শ্রীযুক্তেশ্বরজির উন্নত আধ্যাত্মিক অবস্থান এবং চিরন্তন জ্ঞানের এক আভাস দেওয়া হল। এই অনুচ্ছেদে পরমহংসজি প্রায়শই শ্রীযুক্তেশ্বরজিকে কেবল “গুরুদেব” বলে উল্লেখ করেছেন।

লোটাস্-অরেঞ্জ-লাইনআর্ট

শ্রীযুক্তেশ্বরজির সাহচর্যে থাকার সময় গোড়ার দিকে আমার একটি প্রয়োজনীয় শিক্ষালাভ হয়: “কী করে মশার হাত এড়ানো যায়।” বাড়িতে সকলেই রাত্রিতে মশারি ব্যবহার করত। শ্রীরামপুর আশ্রমে এসে সভয়ে আবিষ্কার করলাম যে, এই সুবিবেচিত প্রথাটি পালনের বদলে লঙ্ঘনই বেশি করা হয়। শ্রীরামপুরে মশার প্রবল উৎপাত; আমাকে তো সারা দেহে কামড় দিত। তা দেখে গুরুজির দয়া হল।

হেসে বললেন, “তোমার জন্যে একটি মশারি কিনে এনো, আর আমার জন্যেও একটা —কারণ শুধু তোমার নিজের জন্যে একটা মশারি কিনলে, মশাগুলো সব আমাকেই এসে ছেঁকে ধরবে!”

অতিশয় কৃতজ্ঞতা সহকারে আজ্ঞাপালনে তৎপর হলাম। শ্রীরামপুরে থাকলে প্রতিরাত্রিতেই গুরুদেব আমায় মশারি টাঙিয়ে দিতে বলতেন।

একদিন রাত্রিবেলায় মশকদল তো প্রচণ্ড বিক্রমে আক্রমণ শুরু করল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সে রাত্রিতে গুরুদেব আমায় অভ্যস্ত নির্দেশ দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। ভীতকম্পিত হৃদয়ে তাদের আবির্ভাবসূচক গুন্গুন্ শব্দ শুনতে লাগলাম। বিছানায় প্রবেশ করে তাদের সকলের উদ্দেশ্যে আমার প্রতি প্রসন্ন হওয়ার জন্য কাতর প্রার্থনা নিবেদন করলাম। আধ ঘণ্টাটাক বাদে আর উপায়ন্তর না দেখে গুরুদেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে একবার কাশির ভাণ করলাম। মনে হল কামড়ের চোটে, বিশেষত এইরকম ‘রক্তলোলুপ’ আক্রমণ চালাবার সময়, তাদের গুন্গুনানিতে আমি বুঝিবা পাগলই হয়ে যাব।

গুরুদেবের কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই বা কোনো নড়নচড়নও নেই। অতি সন্তর্পণে তাঁর কাছে এগোলাম। এখন আর তাঁর কোনো নিঃশ্বাসই পড়ছে না। যোগনিদ্রাভিভূত অবস্থায় তাঁকে আমার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ সেই প্রথম। দেখে কিন্তু আমি মনে খুব ভয় পেয়েই গেছিলাম।

ভাবলাম, “নিশ্চয়ই তাঁর হার্টফেল হয়েছে।” নাকের নীচে একটি আরশি ধরলাম, নিঃশ্বাসের কোনো বাষ্প তাতে লাগল না। আরও সুনিশ্চিত হওয়ার জন্যে মিনিট কতক ধরে তাঁর মুখবিবর আর নাসারন্ধ্র আঙুল দিয়ে বন্ধ করে চেপে ধরে রইলাম। শরীর একদম ঠান্ডা আর অসাড়! হতভম্ব হয়ে সাহায্য পাওয়ার জন্যে কাউকে ডাকতে দরজার দিকে ছুটে গেলাম।

“ও হরি! পরীক্ষা করে দেখছিলে বুঝি? হায়রে, বেচারী আমার নাক!” গুরুজির কণ্ঠস্বর হাস্যোচ্ছ্বল। বললেন, “যাও, বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়োগে। আরে, তোমার জন্যে সারা দুনিয়াটা বদলে যাবে না কি? তুমি আগে নিজেকে বদলাও; মশার কামড়ের ভাবনা একদম ছেড়ে দাও; বুঝলে?”

অত্যন্ত নিরীহভাবে বিছানায় ফিরে গেলাম। এবার আর একটা মশাও কাছে ঘেঁসল না! বুঝলাম, গুরুজি যে এর আগে আমায় মশারি টাঙাতে বলেছিলেন তা কেবল আমার মনতুষ্টির জন্য, তাঁর নিজের কোনো মশার ভয় ছিল না। তাঁর যোগবল এতদূর ছিল যে, হয় তিনি তাদের দংশন নিবারণ করতে পারতেন, অথবা ইচ্ছামতো দংশনযন্ত্রণা প্রতিরোধক অবস্থাতেও প্রবেশ করতে পারতেন।

ভাবলাম, “উনি বোধহয় আমাকে যোগবল প্রদর্শন করছেন। ওইরকম যোগাবস্থা তাহলে আমাকেও লাভ করার চেষ্টা করতে হবে।” প্রকৃত যোগী জগতে সদাবর্তমান বহুবিধ চিত্তবিক্ষেপকারী বিষয়সমূহ অতিক্রম করে — তা সে কীটপতঙ্গের বিরক্তিকর গুঞ্জনধ্বনিই হোক বা দিবালোকের প্রচণ্ড দীপ্তিই হোক—সমাধি অবস্থা লাভ করে সেখানে অবস্থান করতে পারেন। ‘সমাধি’র প্রথম অবস্থায় (সবিকল্প) সাধক বহির্জগতের সর্বপ্রকার ইন্দ্রিয়চেতনা রোধ করেন। তারপর তিনি ইন্দ্রলোকের চেয়েও সুন্দর অন্তর্লোকের ধ্বনি ও দৃশ্যের দ্বারা পুরস্কৃত হন।1

আশ্রমের প্রাথমিক শিক্ষালাভের মধ্যে আর একটি শিক্ষা আমি ওই মশককুলের কাছ থেকেই লাভ করেছি। তখন শান্ত সন্ধ্যা নামছে। গুরুদেব প্রাচীনশাস্ত্রের অনুপম ব্যাখ্যায় রত। তাঁর চরণতলে আমি নীরবে বসে শুনছি। একটা দুষ্ট মশা এই মনোরম পরিবেশের মধ্যে ঢুকে পড়ে আমার মনকে বিক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করল। ঊরুর উপর তার সূক্ষ্ম বিষাক্ত হুল প্রবেশ করাতেই মারার জন্যে আমি হাত ওঠালাম। ভাগ্য তার ভালো। সদ্য প্রাণদণ্ড হতে তার অব্যাহতিলাভ হল, কারণ ঠিক সময়মতো পতঞ্জলির একটি যোগাঙ্গের বিষয় মনে পড়ে গেল,তা হচ্ছে অহিংসা।2

গুরুদেব জিজ্ঞাসা করলেন, “কি হে, শেষ করে ফেললে না যে?”

বললাম, “না গুরুদেব; আপনি কি প্রাণীহিংসা করতে বলেন?”

তিনি বললেন, “তা বলি না বটে, কিন্তু মনে মনে তুমি তো তাকে প্রাণদণ্ড দিয়েই দিয়েছ।”

“ঠিক বুঝতে পারলাম না।”

শ্রীযুক্তেশ্বর গিরিজি আমার মনের কথা যেন একটা খোলা বইয়ের পাতার মতো পড়ে নিয়ে বললেন, “পতঞ্জলির মতে অহিংসা হল জীবহত্যার ‘ইচ্ছা’কে পর্যন্ত ত্যাগ। পৃথিবীতে অহিংসা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার অসুবিধা অনেক। মানুষ অবশ্য হিংস্র প্রাণীদের বিনাশসাধন করতে বাধ্য হতে পারে। কিন্তু ক্রোধ বা দ্বেষ পোষণ করতে অনুরূপভাবে সে বাধ্য নয়। এই দুনিয়ার বাতাসে সব জীবেরই সমান অধিকার। যে যোগী সৃষ্টিরহস্য ভেদ করতে সমর্থ, তিনি প্রকৃতির সংখ্যাতীত বিচিত্র প্রকাশের সঙ্গে একাত্মীভূত। অন্তরে প্রাণীহিংসা দমন করতে পারলে, সব মানুষই এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে।”

“গুরুজি, তাহলে কি হিংস্র প্রাণী বধ না করে তার মুখে নিজেকে বলি দিতে হবে?”

“না; মানুষের দেহ অমূল্য, কারণ এর মধ্যে অপূর্ব মস্তিষ্ক আর মেরুদণ্ডের চক্রগুলি থাকায় এর বিবর্তনের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এরই কারণে সাধনপথে যাঁরা বহুদূর অগ্রসর হয়েছেন, সেইসব ভক্তেরা ঈশ্বরতত্ত্বের উচ্চতম অবস্থা পরিপূর্ণভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে আর তাকে প্রকাশও করতে পারেন। নিম্নস্তরের কোনো প্রাণীর দ্বারা তা সম্ভব নয়। অবশ্য একথাও সত্যি যে, কেউ যদি কোনো পশু বা প্রাণী হত্যা করতে বাধ্য হয়, তাহলে তাকে ছোটোখাটো পাপের ভাগী হতে হয়। কিন্তু পবিত্র শাস্ত্রগুলি এই শিক্ষা দেয় যে, মনুষ্য শরীরের স্বেচ্ছাকৃত নাশ হচ্ছে কর্মবিধির গুরুতর লঙ্ঘন।”

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। সহজাত সংস্কারের ক্ষেত্রে শাস্ত্রমতের অনুমোদন সবসময় পাওয়া যায় না।

যতদূর জানি, গুরুদেবকে কখনও বাঘ বা চিতাবাঘের সামনাসামনি হতে হয়নি। তবে এক কৃতান্তসদৃশ কেউটে তাঁর সামনে পড়েছিল বটে, কিন্তু সেও তাঁর প্রেমের প্রভাবে একেবারে বশীভূত হয়ে পড়েছিল। এই মোলাকাতের ঘটনাটি ঘটেছিল পুরীতে। সেখানে সমুদ্রের ধারে গুরুদেবের আর একটি আশ্রম আছে। শ্রীযুক্তেশ্বর গিরিজির শেষজীবনের প্রফুল্ল নামে একটি তরুণ শিষ্য, সেই ঘটনার সময় গুরুজির কাছে উপস্থিত ছিল।

প্রফুল্ল আমায় বলেছিল : “সে দিন আশ্রমের বাইরে আমরা বসে আছি। কাছেই একটা কেউটে সাপ দেখা গেল, চার ফুট লম্বা — যেন সাক্ষাৎ যম! রাগের চোটে ফণা তুলে সেটা তীরের মতো আমাদের দিকে ছুটে এল। গুরুদেব সাদরে চুক্ চুক্ শব্দ করলেন — যেন একটি ছোটো ছেলেকে আদর করে ডাকছেন। তার ছুটে আসার সঙ্গে সঙ্গে তালে তালে শ্রীযুক্তেশ্বর গিরিজিকে হাততালি3 দিতে দেখে ভয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেলাম। মূর্তিমান যমের সঙ্গে তাঁর খেলা! দারুণ আতঙ্কে আমি একেবারে কাঠ হয়ে রইলাম। মনে মনে সভয়ে ইষ্টনাম জপ করছি; সাপটা তখন গুরুদেবের একেবারে সামনে, কিন্তু কোনো নড়নচড়ন নেই। তাকে নিয়ে তাঁর ওই খেলানোর ভাব দেখে মনে হল যেন সাপটা একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেছে! সেই উদ্যত ফণা ক্রমশ গুটিয়ে গেল; সাপটা গুরুদেবের পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে ঝোপের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।”

প্রফুল্ল বলল, “গুরুদেব কেনই বা হাততালি দিলেন, আর সাপটাই বা তাঁকে কামড়াল না কেন, তা তখন বুঝতে পারিনি। তারপর বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমাদের গুরুদেবতার কোনো প্রাণীর কাছ থেকে কোনোরকম হিংসা বা আঘাতের আশঙ্কা ছিল না।”

পাদটীকা

  1. যোগীর সর্বব্যাপী শক্তি, যাতে করে তিনি বাইরের জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সাহায্য ব্যতীতই রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দাদির জ্ঞানলাভ করতে পারেন, যা ‘তৈত্তিরীয় আরণ্যকে’ নিম্নলিখিতভাবে বর্ণিত হয়েছে: “অন্ধটি মুক্তা ছিদ্র করল, অঙ্গুলিহীন তাতে সূতা পরাল, মুণ্ডহীন সেটা গলায় পরল আর জিহ্বাহীন তাকে প্রশংসা করল।”
  2. “অহিংসায় প্রতিষ্ঠিত হইলে, তৎসন্নিধিতে সর্বপ্রাণী নির্ব্বৈর হয়।” যোগ সূত্র ২:৩৫
  3. নাগালের মধ্যে পেলে কেউটে সাপ যে কোনো চলন্ত জিনিসের উপর বিদ্যুদ্বেগে ছোবল মারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্থির বা একেবারে নিশ্চল অবস্থাই রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায়।

লোটাস্-অরেঞ্জ-লাইনআর্ট

আমরা আপনাকে পরমহংস যোগানন্দের অটোবায়োগ্রাফি অফ এ য়োগি সম্পর্কে আরও জানতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, যা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় কালজয়ী আধ্যাত্মিক গ্রন্থগুলির মধ্যে একটি। এই বইটি বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে এবং মনকে সমৃদ্ধ করেছে।

এই শেয়ার করুন