শ্রী দয়ামাতার ভাষণ স্বজ্ঞা: জীবনের সিদ্ধান্তের জন্য আত্মার পথনির্দেশনা থেকে নেওয়া কিছু অংশ নিম্নে দেওয়া হল যিনি ১৯৫৫ থেকে ২০১০-এ তাঁর দেহাবসান পর্যন্ত ওয়াইএসএস/এসআরএফ-এর সঙ্ঘমাতা ও অধ্যক্ষ পদে কার্যরত ছিলেন।
পরমহংস যোগানন্দ প্রায়শই এটি উল্লেখ করতেন: “ঈশ্বর তাকে সাহায্য করেন যে নিজেকে সাহায্য করে।”
কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যদি কোনো দিব্য শক্তি আমাদের বলে দেয় যে কী করতে হবে, আমরা তার থেকে বেশি আনন্দিত আর হবো না। তা কতই না সহজ হোত; যদি কোনো ক্ষণে, আমরা জানতাম যে আমরা সরাসরি ঈশ্বরের পথনির্দেশনা লাভ করছি তাহলে আমাদের আর কোনো প্রচেষ্টা করতে হোত না।
তবে এ এত সহজ-সরল হওয়ার কথা নয়, ও তার কারণটা হচ্ছে: আমরা ঈশ্বরের অংশ হয়েও তা জানি না — এবং আমরা কোনোদিনই তা জানব না, যদি আমরা কেবল তাঁর ওপর ভার চাপিয়ে দিয়ে বলি, “তুমি বলে দাও আমায় কী করতে হবে,” যেন আমরা পুতুল ও তিনি পুতুল-নাচিয়ে। না, তিনি আশা করেন যে তাঁর পথনির্দেশনা চাওয়ার সঙ্গে আমরা যেন নিজের বুদ্ধিরও ব্যবহার করি যা তিনি আমাদের প্রদান করেছেন।
সর্বোচ্চ প্রার্থনা
জিশু সর্বোচ্চ প্রার্থনা করেছিলেন: “হে প্রভু, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।” এখন, অনেকেই এর ব্যাখ্যা এইভাবে করেন যে তাদের নিজেদের কোনো ইচ্ছা প্রয়োগ বা চিন্তা করার দরকার নেই, কেবল বসে-বসে ধ্যান করা ও অপেক্ষা করা উচিত যে ঈশ্বর তাদের মাধ্যমে কিছু একটা করবেন। এটা ভুল। আমরা তাঁরই প্রতিকৃতিতে রচিত।
তিনি তাঁর সৃষ্ট সকল জীবের চেয়ে মানুষকে বেশি বুদ্ধি প্রদান করেছেন, ও তিনি চান যে আমরা তার প্রয়োগ করি। সেজন্য পরমহংসজি আমাদের প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন:
“হে ঈশ্বর, আমি যুক্তি প্রয়োগ করব, আমি ইচ্ছা-শক্তি প্রয়োগ করব, আমি কাজ করব, কিন্তু তুমি আমার যুক্তি, ইচ্ছাশক্তি ও কর্মকে সঠিক কার্যের দিকে পরিচালিত করো যা আমার করা উচিত।”
আমরা আশ্রমে নিষ্ঠা সহকারে এটি পালন করি। আমাদের কাজ সংক্রান্ত বৈঠকে, আমরা স্বল্পক্ষণ ধ্যান করি ও তারপরে ওই প্রার্থনাটি উৎসর্গ করি। কেবলমাত্র তারপরেই আমরা আলোচনায় প্রবেশ করি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।
তাই, চুপ করে বসে থেকে ঈশ্বর প্রয়োজনীয় কাজ করে দেবেন, এই আশা কোরো না। যুক্তি, ইচ্ছাশক্তি ও কর্মের তত্ত্ব প্রয়োগ করে যা সব থেকে ভালো মনে হয়, তাই করো।
অধ্যবসায়ের সঙ্গে, নিজের ইচ্ছাশক্তি ও বুদ্ধি প্রয়োগ করে কাজ করো আর তার সঙ্গে অনবরত প্রার্থনা করো: “হে প্রভু, আমায় পথ দেখাও; আমি যেন তোমার ইচ্ছার অনুসরণ করতে পারি। কেবল তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক।”
এই করে তুমি তোমার মনকে তাঁর পথনির্দেশনার প্রতি সুগ্রাহী করে রাখো। তখন হয়তো তুমি হঠাৎ পরিষ্কার দেখতে পাবে, “না, এখন অবশ্যই আমাকে এই অভিমুখে যেতে হবে।” ঈশ্বরই তোমাকে পথ দেখান।
কিন্তু মনে রাখা দরকার যে ঈশ্বরের কাছে পথনির্দেশনা কখনও বদ্ধ মন নিয়ে চাইতে নেই; মন যেন সর্বদা উন্মুক্ত ও সুগ্রাহী থাকে। এইভাবেই ঈশ্বর তাদের সাহায্য করেন, যারা নিজেদের সাহায্য করে। এতে কাজ হয়, তবে আমাদেরই উদ্যোগী ও উদ্যমী হতে হবে।
ঈশ্বরের কাজ করার জন্য ও তাঁর ইচ্ছা অনুসরণ করার জন্য কোনো আশ্রমে থাকার প্রয়োজন নেই। আমরা প্রত্যেকে ঈশ্বর ও আমাদের পূর্ব কর্ম দ্বারা নির্ধারিত পরিস্থিতিতেই আছি। যদি তুমি তোমার বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট না হও,তাহলে ধ্যান করে ঈশ্বরের কাছে পথনির্দেশনার জন্য প্রার্থনা করো। কিন্তু তা করার সময় তোমার ঈশ্বরপ্রদত্ত যুক্তির প্রয়োগ করো। তোমার কাছে জীবন ও ভবিষ্যত সংক্রান্ত যে বিকল্প আছে, তা বিশ্লেষণ করো।
বিবেক ও স্বজ্ঞা: অন্তরের দিব্য কণ্ঠস্বর
অন্তরের দিব্য কণ্ঠস্বর আমাদের সকল সমস্যার সমাধান করতে সাহায্য করবে। এই বিবেকের কণ্ঠস্বর হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে নিহিত দিব্য পথনির্দেশনার এক ঈশ্বরপ্রদত্ত উপকরণ।
কিন্তু অনেকেই এই কণ্ঠস্বর শুনতে পায় না কারণ এক বা অগণিত জন্ম ধরে তারা একে গুরুত্ব দিতে অস্বীকার করেছে। পরিণাম স্বরূপ, এই কণ্ঠস্বর নীরব বা অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। কিন্তু যখন কেউ আপন জীবনে কার্যের মধ্য দিয়ে সঠিক আচরণ করতে আরম্ভ করে, অন্তরের এই মৃদু ধ্বনি আবার জোরালো হয়ে ওঠে।
আংশিক স্বজ্ঞাসম্পন্ন বিবেকের অতীতে আছে বিশুদ্ধ স্বজ্ঞা, যা আত্মা দ্বারা অনুভূত সত্যের বা অভ্রান্ত দিব্য কণ্ঠস্বরের প্রত্যক্ষ অনুভূতি।
আমাদের সকলকেই স্বজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। আমাদের পাঁচটি দৈহিক ইন্দ্রিয় আছে এবং ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ও আছে, তা হচ্ছে সর্বজ্ঞ স্বজ্ঞা। আমরা আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে জগতের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখি: আমরা স্পর্শ করি, শুনি, ঘ্রাণ নেই, আস্বাদন করি ও দেখি। অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়, স্বজ্ঞাজনিত বোধ ব্যবহার না করার কারণে অবিকশিত থেকে যায়।
যদি কারোর চোখ শৈশবকাল থেকে বাঁধা থাকে, এবং বহু বছর পরে তা খোলা হলে সে সবকিছু ঝাপসা দেখে। যদি বাহু অনড় করে রাখা হয়, অব্যবহারের ফলে তা সঠিকভাবে বিকাশলাভ করবে না। একই ভাবে, অব্যবহারের ফলে বহুসংখ্যক মানুষের মধ্যে স্বজ্ঞা আর কাজ করে না।
ধ্যান স্বজ্ঞা-শক্তিকে বিকশিত করে
কিন্তু স্বজ্ঞা বিকশিত করার একটি উপায় আছে। যতক্ষণ না আমরা দেহ ও মনকে শান্ত করছি, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করতে পারে না। তাই, স্বজ্ঞা বিকশিত করার প্রথম ধাপ হচ্ছে ধ্যান, এক অভ্যন্তরীণ প্রশান্তির অবস্থায় প্রবেশ করা।
কোনো সমস্যার ওপর মনকে কেন্দ্রিত করার আগে যত গভীর ভাবে ধ্যান করবে, তত বেশি সেই সমস্যা সমাধানের জন্য তোমার স্বজ্ঞা-শক্তির অভিব্যক্তি ঘটবে। এই শক্তি ধীরে-ধীরে বিকশিত হয়, হঠাৎ করে নয়; ঠিক যেমন কোনও মাংসপেশি বা অঙ্গ ব্যায়াম করতে করতে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে — তা রাতারাতি হয় না….
যদি আপনার নিত্য ধ্যানের অভ্যাস আরম্ভ ও বলবৎ করা সম্পর্কে আরও জানার ইচ্ছে থাকে — প্রয়োজনীয় স্থিরতা ও প্রশান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে, যে অবস্থায় চেতনায় “স্বজ্ঞার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়”এর আরও বেশী প্রকাশ ঘটে ও তাকে আপন জীবনে আরও বেশী করে প্রয়োগ করা যায় — তাহলে পরিচালিত ও সমবেত ধ্যানের অভিজ্ঞতালাভের জন্য নিম্নে দেওয়া লিঙ্ক দেখুন।

















