স্বাধীনতা বলতে পরমহংস যোগানন্দের কী ধারণা — স্বামী চিদানন্দ গিরি

১৪ জুলাই, ২০২৬

২০২০-র ১৯ সেপ্টেম্বর এসআরএফ মাদার সেন্টারে ওয়াইএসএস/এসআরএফ অধ্যক্ষের আলোচনা এবং যোগদা সৎসঙ্গ পত্রিকার ২০২১-এর জানুয়ারি-মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত “পরমহংস যোগানন্দ: এক ঐতিহাসিক সেতুবন্ধনকারী” শীর্ষক বক্তৃতা থেকে নির্বাচিত অংশ। পরমহংস যোগানন্দের আমেরিকায় আগমনের শতবর্ষ পূর্তি উদ‌যাপন অনুষ্ঠানে স্বামী চিদানন্দ গিরি বক্তব্য রাখছিলেন। আমরা আশা করি এই ব্লগ পোস্টটি আপনাকে ধ্যানের যোগবিজ্ঞান প্রয়োগ করতে অনুপ্রাণিত করবে, যাতে পরমহংসজি পাশ্চাত্যে তাঁর প্রথম ভাষণ থেকেই যে আত্মিক মুক্তির গুণকীর্তন করছিলেন, তা আপনার জীবনের এক স্থায়ী সত্যে পরিণত হয়।

লোটাস-অরেঞ্জ-লাইনআর্ট

বাহ্যিকভাবে পরমহংস যোগানন্দ ছিলেন একজন হিন্দু, স্বেচ্ছায় আমেরিকান হয়ে ওঠা একজন নাগরিক, একজন বিশ্বনাগরিক। কিন্তু তাঁর প্রকৃত সত্তা হল তিনি অন্তরে যা ছিলেন। একটি কবিতায় তিনি তাঁর নিজের অন্তরের উপলব্ধি প্রকাশ করেছেন:

আমার নেই কোনো দেশ, নেই কোনো প্রিয় মাতৃভূমি;
ঋষিও নই আমি — হিন্দু বা খ্রিস্টান;
না প্রাচ্যের, না প্রতীচ্যের, জাতিবদ্ধ নই আমি ঐতিহ্যের কারাগারে…।
স্বাধীনতায় উচ্ছ্বসিত আত্মা আমার —
স্বাধীনতা, একমাত্র ধর্ম তার…।

সকলের অজ্ঞাতে, কিন্তু জ্ঞাত আমার আত্মার কাছে,
আনন্দে জাগি, চলি, স্বপ্ন দেখি,
খাইদাই আর আনন্দে ভেসে বেড়াই।
যে আনন্দ খুঁজেছি, নিজেই সে আনন্দ আমি —
যে আনন্দ খুঁজে ফেরে সবাই।

ভেবে দেখো: “স্বাধীনতায় উচ্ছ্বসিত আত্মা আমার – স্বাধীনতা, একমাত্র ধর্ম তার।” কি অদ্ভুত, কারণ এটা আমাদের পরমহংসজির বস্টনে আসার কাহিনিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি ১৯২০-তে কংগ্রেস অফ রিলিজিয়াস লিবারালস -এ বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন। সেই মহাসভা — যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মীয় নেতারা একত্রিত হয়েছিলেন — যা স্বাধীনতার সন্ধানে আমেরিকায় ইংরেজ বসতি স্থাপনকারীদের আগমনের ৩০০তম বার্ষিকী উদযাপনের সঙ্গে একই সময়ে আয়োজিত হয়েছিল; এবং আয়োজকরা যে বিষয়বস্তুটি দিয়েছিলেন তা ছিল, “স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য কী?”

আমরা জানি, আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে (Declaration of Independence) লিখেছিলেন: “আমরা এই সত্যকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করি যে, সকল মানুষ সমানভাবে সৃষ্ট, এবং সৃষ্টিকর্তার থেকে তারা কিছু সহজাত অধিকার লাভ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে জীবন, স্বাধীনতা এবং আনন্দের অন্বেষণ।” এগুলো প্রেরণাদায়ক কথা — চিরন্তন কথা। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ হয়ত উপলব্ধি করেন না যে এই কথাগুলো নিতান্তই যোগের কথা। আসলে, আমার মনে হয় আমরা বলতে পারি যে যোগ রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক এবং সেইসব বিপ্লবী নেতাদের থেকেও আরও গভীরে যায়। যোগশাস্ত্র বলে যে, জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের অন্বেষণ কেবল সহজাত অধিকারই নয়, বরং এই সহজাত প্রবৃত্তি বা প্রক্রিয়াগুলো মানব প্রকৃতির মূল কাঠামোতেই নিহিত আছে।

ভেবে দেখুন পরমহংসজি যে রাজযোগের বিজ্ঞান নিয়ে এসেছিলেন, সে সম্বন্ধে এসআরএফ [ওয়াইএসএস] পাঠমালায় এবং আপনার নিজের ধ্যানচর্চায় আপনি কী শিখেছেন; আর জীবন, স্বাধীনতা ও আনন্দের অন্বেষণের এই ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি চিন্তা করুন। যোগশাস্ত্র আমাদের বলে যে জীবনীশক্তি (প্রাণ), স্বাধীনতা (বা স্বাধীন ইচ্ছা), এবং আনন্দের অন্বেষণ (অথবা, আমরা বলতে পারি, পরম আনন্দের জন্য আত্মার আকাঙ্ক্ষা) — এগুলো এমন শক্তি যা আমাদের অনুমতির অপেক্ষা ছাড়াই আত্মার দশটি যন্ত্রের (পঞ্চ ইন্দ্রিয় এবং শারীরিক ক্রিয়ার পঞ্চযন্ত্র) মাধ্যমে কাজ করে। এই জন্যই আমি বলি যে, এগুলো শুধু সহজাত অধিকারই নয়, বরং সহজাত প্রবৃত্তি বা প্রক্রিয়া।

আমি এই বিষয়টি নিয়ে আর একটু গভীরে যেতে চাই, কারণ এর ওপর ভিত্তি করেই আমরা ১৯২০-র সেই সম্মেলনে পরমহংসজির দেওয়া ‘ধর্মবিজ্ঞান’ শীর্ষক বক্তৃতাটিকে দেখব। তাঁর শিক্ষাবলিতে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, গর্ভধারণের সময় আমরা জীবনীশক্তি ও চেতনার সূক্ষ্মশরীর ও কারণশরীর দ্বারা আবৃত এক দিব্য আত্মা রূপে এই দেহে প্রবেশ করি। আর আত্মা সেই প্রাণ ও চৈতন্যকে দেহ-মনের যন্ত্রে বর্ষণ করে। এটাই মানব দশা; এ ব্যাপারে আমাদের কোনো পছন্দ-অপছন্দের অবকাশ নেই। জীবন নিম্নমুখী ও বহির্মুখী স্নায়ুতন্ত্রে ও সকল ইন্দ্রিয়ে প্রবাহিত হয় আর দেহকে পুষ্ট ও সজীব করে তোলে; আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, আমরা চাই বা না চাই, আত্মাকে সেই দেহের সঙ্গে অভিন্নতায় বিশ্বাসী করে তোলে।

কিন্তু যে বিষয়টার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ আছে, তা হল আমরা সেই দেহে কীভাবে বাস করব — আমরা দেহের সঙ্গে এবং তার ইন্দ্রিয়গত কামনা ও অভ্যাসের মরীচিকার সঙ্গে একাত্ম থাকব কি থাকব না, যা আমাদের বেঁধে রাখে ও দাসত্বে আবদ্ধ করে। সেটাই প্রকৃত দাসত্ব — আমাদের আসল রূপ সম্পর্কে সেই ভ্রান্ত ধারণার সঙ্গে আত্মার আবদ্ধ থাকা। ক্রিয়াযোগ — এসআরএফ/ওয়াইএসএস-এর যে শিক্ষাবলি আমাদের গুরু ১০০ বছর আগে পাশ্চাত্যে এবং ফলস্বরূপ সারা বিশ্বে নিয়ে এসেছিলেন — আমাদের আত্মার অভিন্নতাবোধের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের বিজ্ঞান প্রদান করে। এই ক্ষমতা সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে আমরা আত্মা রূপে কিছু বাহ্যিক ভূমিকা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে অভিন্নতা বোধ করি, তা ভালো বা মন্দ যাই হোক না কেন। পুরো ব্যাপারটাই নির্ভর করে আমরা জীবন, স্বাধীনতা এবং আনন্দ অন্বেষণের সেই শক্তিকে — আমাদের জীবনীশক্তি, আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে — কীভাবে পরিচালনা করি এবং অসীম আনন্দের জন্য আমাদের আত্মার আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্ণতা কোথায় খুঁজি তার উপর।

স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ধর্মবিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন

আপনারা জানেন, সেখানে তাঁর উপস্থাপনাটির শিরোনাম ছিল, “ধর্মবিজ্ঞান,” এবং একই নামে একটি ছোট — কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী — বইও প্রকাশিত হয়েছিল, যা সম্প্রতি আমরা [এসআরএফ] এসআরএফ শতবার্ষিকী সংস্করণ হিসেবে পুনঃপ্রকাশ করেছি। প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য এর তাৎপর্যের নিরিখে, আমাদের গুরু সেই মহাসভায় যা বলেছিলেন, তাকে আমরা তিনটি মূল বক্তব্যে প্রকাশ করতে পারি।

প্রথমত, গুরুদেব যেমন বইটিতে বলেছেন, “নশ্বর দেহ ও চঞ্চল মনের সঙ্গে একাত্মতার অনুভূতিই আমাদের আধ্যাত্মিক সত্তার দুঃখের উৎস বা মূল কারণ।”

দ্বিতীয় বিষয়টি এই যে, ধর্মকে যদি সঠিকভাবে ধারণা করা যায়, তবে ধর্ম হল এই ধরনের দুঃখকে স্থায়ীভাবে এড়িয়ে যাওয়া এবং বিশুদ্ধ পরমানন্দ বা ঈশ্বর প্রাপ্তির সমন্বয়। এটাই ছিল তাঁর ধর্মের সর্বজনীন সংজ্ঞা।

তৃতীয় বিষয়টি হল এই যে, আমরা তাঁর ভাষায় “সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত, সবচেয়ে মৌলিক এবং সকলের জন্য প্রয়োগসাধ্য পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারি, যা চির-আনন্দময় আত্মাকে নশ্বর দেহ ও মনের সঙ্গে তার অনিষ্টকর সংযোগ ও অভিন্নভাব থেকে মুক্ত করবে, যার ফলে সে স্থায়ীভাবে যন্ত্রণা এড়িয়ে পরমানন্দ লাভ করবে, এই হল ধর্ম।”

এখন এই বিষয়টা হয়তো কিছুটা দার্শনিক বা দুর্বোধ্য, কিন্তু আমি চাই আমরা দেখি যে কীভাবে গুরুদেব স্বাধীনতার সেই সমগ্র ধারণাটি নিয়ে দেখিয়েছেন যে স্বাধীনতা পুরোপুরি ধর্মবিজ্ঞানে বিশেষ দখলের ওপর নির্ভরশীল। যেমন তিনি বলেছেন: “চির-আনন্দময় আত্মাকে নশ্বর দেহ ও মনের সঙ্গে তার অনিষ্টকর সংযোগ ও অভিন্নভাব থেকে মুক্ত করা।” অন্যভাবে বলতে গেলে, তিনি আমেরিকানদের এবং বিশ্বের প্রতিটি দেশের সকল নাগরিকদের এটাই দেখাতে চাইছিলেন যে, যতক্ষণ না আমাদের স্বাধীনতা ও সাম্যের সামাজিক আদর্শগুলো স্বাধীনতার আধ্যাত্মিক আদর্শ — অর্থাৎ আমাদের নিম্নসত্তার অবক্ষয়ী প্রবৃত্তি থেকে মুক্তি দ্বারা সমর্থিত ও অনুপ্রাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই সামাজিক আদর্শ, তা আমেরিকায় হোক বা অন্য কোনো দেশে, কেবল আংশিকভাবেই বাস্তবায়িত হতে পারবে।

আমরা কতই না ভাগ্যবান যে এসআরএফ/ওয়াইএসএস পাঠমালায়, অর্থাৎ পরমহংস যোগানন্দের শিক্ষাবলিতে, তিনি আমাদের সেই আত্মপরিচয়ের প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সঠিক মনোভাব, সঠিক সঙ্কল্পবাক্য এবং সর্বোপরি সঠিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া শিখিয়েছেন। এটাই হল যোগবিজ্ঞান, ধর্মবিজ্ঞান – এই উপলব্ধি করা যে আমাদের প্রকৃত পরিচয় হল আত্মার সঙ্গে একত্ব, ঈশ্বরের সঙ্গে একত্ব; এবং এই উপলব্ধি করা যে অন্য সকল অস্থায়ী পরিচয়গুলো সীমাবদ্ধতা, আসক্তি, কর্ম, ক্লেশসমূহ — পতঞ্জলির যোগসূত্রে উল্লিখিত পঞ্চক্লেশ নিয়ে আসে। “ধর্মবিজ্ঞান” — স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ নিয়ে এর চেয়ে উপযুক্ত, বিস্তৃত ও গভীর উপস্থাপনা আর কী হতে পারে!

পাদটিকা:

  • ১. যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া প্রকাশিত সংস অফ দ্য সোল গ্রন্থের “ইন দ্য ল্যান্ড অফ ড্রিমস” থেকে নির্বাচিত অংশ।
  • ২. এর এক দশকেরও বেশি আগে, ১৬০৭ -এ, ইংল্যান্ড থেকে আগত অভিবাসীদের দ্বারা ভার্জিনিয়ায় আরেকটি স্থায়ী বসতি স্থাপিত হয়েছিল; কিন্তু এই গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য ধর্মীয় স্বাধীনতার অন্বেষণ না হয়ে, প্রধানত বাণিজ্যিক প্রকৃতির ছিল।
  • ৩. গড টকস উইথ অর্জুন: দ্য ভগবদ্গীতা গ্রন্থে পরমহংস যোগানন্দ ব্যাখ্যা করেছেন: “যোগসূত্রে ২:৩, ক্লেশ বা দুঃখকে পঞ্চবিধ আখ্যায়িত করা হয়েছে: অবিদ্যা (অজ্ঞানতা), অস্মিতা (অহং), রাগ (আসক্তি), দ্বেষ (বিমুখতা), অভিনিবেশ (দেহ আসক্তি)।”
  • লোটাস-অরেঞ্জ-লাইনআর্ট

    আমরা আপনাদের যোগদা সৎসঙ্গ পাঠমালা — যোগধ্যানের বিজ্ঞান এবং সম্যক জীবনযাপন শৈলীর ওপর পরমহংস যোগানন্দের মূল শিক্ষা সম্পর্কে আরও জানার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

    আপনি স্বামী চিদানন্দজির ২০২০-র এসআরএফ শতবার্ষিকী বক্তৃতার এই অংশটি এসআরএফ ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিও হিসেবেও দেখতে পারেন।

    এই শেয়ার করুন